আর মাত্র কয়েকটি প্রহর পরই জাতীয় নির্বাচন। ফলে নির্বাচনী উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতাকর্মীরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রচারণায় ব্যস্ত, জনগণের সমর্থন আদায়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নির্বাচনী উৎসবমুখর পরিবেশে এ দৃশ্য স্বাভাবিকই।
কিন্তু হতাশার বিষয় হলো—দেশে কাগুজে সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও বাস্তব জীবনে দায়িত্বশীল ও শালীন আচরণের ঘাটতি ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। ভিন্ন মত বা চিন্তার মানুষকে হেয় করতে এখনো অমূলক অভিযোগ, মিথ্যা তথ্য ও কুৎসা ছড়ানোর পুরনো সংস্কৃতি চালু রয়েছে।
আরও দুঃখজনক হলো, এ সমাজের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান হয়েও শুধুমাত্র মতের পার্থক্যের কারণে জেনেশুনে অপর মুসলমানের সম্মান ক্ষুণ্ন করতে নোংরা পথ অবলম্বন করছে। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে এটি গুরুতর অপরাধ। মিথ্যা অপবাদ, গিবত কিংবা তাচ্ছিল্যের মাধ্যমে অন্যকে হেয় করা মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য—যার মাধ্যমে তারা মহানবী (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামকে কষ্ট দিত।
কোনো মুসলমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালানো শরিয়তসম্মতভাবে সম্পূর্ণ অবৈধ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন,
“আর যারা কোনো দোষ ছাড়া মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের কষ্ট দেয়, তারা অবশ্যই অপবাদ ও সুস্পষ্ট গুনাহ বহন করে।”
(সুরা আহজাব, আয়াত : ৫৮)
এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়—শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া কোনো মুসলমানকে কষ্ট দেওয়া হারাম। (ফাতহুল কাদির)
এ অপরাধের ভয়াবহতা বোঝাতে মহানবী (সা.) একে সুদের মতো মহাপাপের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সাঈদ ইবনে জায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
“অন্যায়ভাবে কোনো মুসলমানের মানসম্মানে আঘাত করা ব্যাপকতর সুদের অন্তর্ভুক্ত।”
(সুনানে আবু দাউদ : ৪৮৭৬)
অর্থাৎ হিংসা-বিদ্বেষের বশে কথা বা কাজের মাধ্যমে কারও ইজ্জত ক্ষুণ্ন করা—সম্পদের সুদের চেয়েও ভয়াবহ অপরাধ।
হয়তো সাময়িকভাবে অপপ্রচার চালিয়ে কিছু লাভ অর্জন করা যায়, কিন্তু এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়ংকর। আল্লাহ তাআলা কখনো সাময়িক অবকাশ দিলেও শেষ পর্যন্ত প্রতিটি কাজের হিসাব নেবেন। মানুষের সম্মান রক্ষা যে কত মূল্যবান—তা বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) কাবাঘরের মর্যাদার সঙ্গেও মুমিনের ইজ্জতের তুলনা করেছেন।
(ইবনে মাজাহ : ৩৯৩২)
অথচ আমরা সামান্য পদ-পদবি বা অর্থের লোভে মানুষের সম্মান ধ্বংস করতে দ্বিধা করি না। এই প্রবণতা ঈমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং মানুষকে জাহান্নামের পথে ঠেলে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলমানরা নিরাপদ, সেই প্রকৃত মুসলিম।”
(তিরমিজি : ২৬২৭)
নির্বাচন ঘিরে কোথাও কোথাও সহিংসতার ঘটনাও ঘটছে, যা মুসলিম সমাজের জন্য চরম লজ্জাজনক। কোরআনে ইচ্ছাকৃত হত্যার শাস্তি হিসেবে জাহান্নামের কঠিন আজাবের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
(সুরা নিসা : ৯৩)
এমনকি অস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখানো সম্পর্কেও মহানবী (সা.) কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
(মুসলিম : ৬৫৬০, বুখারি : ৭০৭১)
অতএব আমাদের উচিত—মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এক উম্মত হয়ে থাকা, পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্যেও ইসলামী শিষ্টাচার রক্ষা করা। ঈমান, ইসলাম ও দেশের কল্যাণের প্রশ্নে বিভক্তি নয়—ঐক্যই হোক আমাদের পথচলা।