মুখপত্র
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ০৭:২২ এএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ১১ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:২৩ এএম

কলম্বিয়ায় ৭.৪ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প, নিহত ১৩২

আন্তর্জাতিক
Sub Editor
কলম্বিয়ায় ৭.৪ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প, নিহত ১৩২
ভূমিকম্পের পর কলম্বিয়ার কালিতে ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপে বাসিন্দা ও উদ্ধারকর্মীদের তল্লাশি। ১০ আগস্ট ২০২৬।ছবি /এবিসি নিউজ

শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়া। স্থানীয় সময় সোমবার সকালে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ১৩২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ৫৭০ জনের বেশি। ধসে পড়া বহু ভবনের নিচে এখনও মানুষ আটকা থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

ভূমিকম্পের পর দেশজুড়ে জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করেছে কলম্বিয়া সরকার। উদ্ধারকারী দলগুলো ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছে। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের একাধিক শহরে ভবন, সড়ক ও বিমানবন্দরের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কয়েক বছরের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প

কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৩৪ মিনিটে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর উৎপত্তিস্থল ছিল দেশটির চোকো প্রদেশের সান হোসে দেল পালমার এলাকার কাছে এবং ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল প্রায় ১০৩ কিলোমিটার।

ভূমিকম্পের কম্পন পশ্চিম কলম্বিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা ছাড়িয়ে রাজধানী বোগোতাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুভূত হয়। এমনকি প্রতিবেশী ভেনেজুয়েলা, ইকুয়েডর ও পানামা থেকেও কম্পন অনুভূত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পেরেইরা

ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির খবর এসেছে পেরেইরা শহর ও আশপাশের এলাকা থেকে। উৎপত্তিস্থল থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দূরের এই শহরে বহু ভবন ধসে পড়েছে।

স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পেরেইরার মহানগর এলাকায় অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৬৫টি ভবন ধসে পড়েছে। এর মধ্যে ১৫টি ভবনের ধ্বংসস্তূপে মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শহরের প্রধান চত্বর প্লাজা বলিভারে একটি ভবন ধসে পড়ার দৃশ্যও ছড়িয়ে পড়েছে। ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসাবশেষ ও ধুলায় চত্বরটি ঢেকে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শহরের কিছু এলাকায় স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ভোর ৫টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়েছে।

ক্যালিতেও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ

পেরেইরা থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত কালি শহরেও ভূমিকম্পের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। সেখানে অন্তত ৩২টি ভবন ধসে পড়েছে।

ভূমিকম্পের সময় কালি শহরে অবস্থান করছিলেন লন্ডনের ২৯ বছর বয়সী পর্যটক ড্যান কাটলার। তিনি জানান, প্রচণ্ড কম্পনে ঘুম ভেঙে গেলে তিনি ও তার সঙ্গী দ্রুত পায়জামা পরেই হোটেল থেকে বাইরে বেরিয়ে যান।

তার ভাষায়, তিনি এর আগে কখনো এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হননি। হোটেলের বড় ধরনের কাঠামোগত ক্ষতি না হলেও দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং দেয়ালের রং ও প্লাস্টার খসে পড়েছে।

ম্যানিজালেসেও প্রাণহানি

ম্যানিজালেস, কিবদো, মেডেলিনসহ চোকো ও ভায় দেল কাওকা অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গা থেকেও হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।

ম্যানিজালেসে অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন। সেখানে অবস্থানকারী অ্যাঞ্জেলিকা আভিলা জানান, ভূমিকম্প শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হোটেলের দেয়ালে ফাটল দেখা দেয়। আশপাশের ভবন থেকে ধুলা বের হতে দেখা যায় এবং দেয়াল থেকে ইট খসে পড়তে থাকে।

ম্যানিজালেসের সাংবাদিক ও আবহাওয়াবিদ লুইস ফেলিপে মোলিনা জানান, ভূমিকম্পের সময় তিনি নিজের বাড়িতে ছিলেন। শহরটিতে অতীতের ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতার কারণে ভবন নির্মাণে কঠোর ভূমিকম্প-প্রতিরোধী বিধিমালা রয়েছে। ফলে তার ভবনটি বড় ধরনের ক্ষতি ছাড়াই কম্পন সহ্য করতে সক্ষম হয়।

তবে তার ঘরে থাকা প্রায় ৪৫০টি বইয়ের অধিকাংশই তাক থেকে পড়ে যায়। একই সঙ্গে কাচ ভাঙার শব্দ ও মানুষের চিৎকারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

ক্ষতিগ্রস্ত বিমানবন্দর, বোগোটাতেও আতঙ্ক

কলম্বিয়ার বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পেরেইরা, ম্যানিজালেস, কিবদো, আরমেনিয়া, কার্তাগো ও বুয়েনাভেনতুরাসহ কয়েকটি আঞ্চলিক বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাজধানী বোগোতায় ভূমিকম্পের সময় গাছ ও ট্রাফিক সিগন্যালগুলো প্রচণ্ডভাবে দুলতে দেখা যায়। কয়েকটি ভবনে ফাটলের খবর পাওয়া গেলেও রাজধানীর অবকাঠামোয় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

জরুরি অবস্থা ঘোষণা

ভূমিকম্পের ভয়াবহতা বিবেচনায় কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা জাতীয় দুর্যোগ পরিস্থিতি ঘোষণা করেছেন। এর ফলে সরকার জরুরি তৎপরতার জন্য বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বাজেট পুনর্বিন্যাস করতে পারবে।

প্রেসিডেন্ট জানান, ভূমিকম্পে ১ হাজার ৫০০টির বেশি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুক্রবার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নতুন প্রেসিডেন্টকে দেশের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় নেতৃত্ব দিতে হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সহায়তার আশ্বাস

ভূমিকম্পের পর কলম্বিয়ার পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন হলে সহায়তা দিতে প্রস্তুত। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন জানিয়েছেন, উদ্ধার তৎপরতায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস স্যাটেলাইট ব্যবহৃত হচ্ছে।

এদিকে এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে কলম্বিয়ার জনগণের প্রতি সংহতি জানিয়ে উদ্ধার অভিযানে জনবল ও সরঞ্জাম পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) জানিয়েছে, প্রায় ১৫ লাখ মানুষ সাত মাত্রার কাছাকাছি শক্তিশালী কম্পন অনুভব করেছেন। ভূমিকম্পটির গভীরতা বেশি হওয়ায় সাধারণত ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি সংঘটিত ভূমিকম্পের তুলনায় এর প্রভাব কিছুটা কম হওয়ার কথা। তবে গভীর ভূমিকম্পও ভবনের ওপর ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং এর পরবর্তী কম্পন বা আফটারশক তুলনামূলক কম হলেও শক্তিশালী হতে পারে।

উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র প্রকাশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সম্পাদক ও প্রকাশক | উইনিং গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান।

© 2026 মুখপত্র। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।