মুখপত্র
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০১ নভেম্বর, ২০২৬, ০১:৪১ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ২৩ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:৩৯ এএম

পরিবারগুলো মরদেহ উদ্ধার করতেই গাজায় ফুরিয়ে আসছে দাফনের জায়গা

আন্তর্জাতিক
Sub Editor
পরিবারগুলো মরদেহ উদ্ধার করতেই গাজায় ফুরিয়ে আসছে দাফনের জায়গা
দেইর আল-বালাহ কবরস্থান: প্রিয়জনদের কবর জিয়ারত করছেন ফিলিস্তিনিরা।ছবি: আল জাজিরা

গাজায় দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও ব্যাপক প্রাণহানির পাশাপাশি মৃতদের দাফন করাও কঠিন হয়ে উঠেছে। কবরস্থানে জায়গার সংকট, কবরস্থান ধ্বংস এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অভাবে স্বজনদের অনেককে মৃতদের জন্য বিকল্প জায়গা খুঁজতে হচ্ছে।

২০ বছর বয়সী ওমর আল-সাওহির বাবা মোহাম্মদ আল-সাওহি (৪০) গত ১০ জুন গাজা সিটির জেইতুন এলাকায় একটি ছোট চা-কফির দোকানে কাজ করার সময় গলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। ইসরায়েলি বাহিনীর নির্ধারিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর কাছাকাছি এ ঘটনা ঘটে।

বাবাকে দাফন করতে ওমর জেইতুন কবরস্থানে গেলে দেখতে পান, সেখানে কবরগুলো অত্যন্ত ঘন হয়ে গেছে। জায়গার অভাবে অনেক কবর শুধু একটি পাথর ও মৃত ব্যক্তির নাম লেখা কাগজ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ওমর জানান, একটি নতুন কবর তৈরির খরচ প্রায় ৫০০ শেকেল। এই অর্থ তাদের পরিবারের পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। একই সঙ্গে নতুন কবরের জন্য পর্যাপ্ত জায়গাও পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত তার বাবাকে দাদার কবরে দাফন করতে হয়েছে।

গাজার যুদ্ধের কারণে দাফন ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ, নিরাপত্তাঝুঁকি ও পরিষেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বহু মৃতদেহ দীর্ঘ সময় নিখোঁজ হিসেবে থেকে গেছে। অনেককে বাড়ির আঙিনা, তাঁবু, বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়কেন্দ্র, স্কুল কিংবা হাসপাতালের এলাকায় অস্থায়ীভাবে দাফন করা হয়েছে।

২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর কিছু পরিবার ধ্বংস হওয়া বাড়ি ও অস্থায়ী কবর থেকে স্বজনদের মরদেহ উদ্ধার করে স্থায়ী কবরস্থানে স্থানান্তরের চেষ্টা শুরু করে। গাজার কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতাল এলাকায় সাতটি গণকবর থেকে ৫২৯ ফিলিস্তিনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

দাফনের জায়গার সংকটের পেছনে বড় কারণ কবরস্থান ধ্বংস হওয়াও। গাজার ধর্মীয় বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর ৪০টির বেশি কবরস্থান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় কবরস্থানে প্রবেশের ওপর বিধিনিষেধ থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে।

যুদ্ধের কারণে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হওয়ায় আগে কবরস্থানের জন্য নির্ধারিত কিছু এলাকাও এখন আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রীর সংকটের কারণে একটি দাফনের মোট খরচ বর্তমানে প্রায় ৭০০ থেকে ১ হাজার শেকেলে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।

কবরের স্থায়ী চিহ্ন তৈরির সামর্থ্য না থাকায় অনেক পরিবার ধ্বংস হওয়া ভবনের ইট-পাথর, কাদা কিংবা টিন ব্যবহার করে অস্থায়ীভাবে কবর চিহ্নিত করছে।

গাজার ধর্মীয় বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ইকরামি আল-মাদালাল জানান, যুদ্ধ শুরুর আগেই গাজার ৬০টি কবরস্থানের অনেকগুলো প্রায় পূর্ণ ছিল। এখন নতুন কবরস্থানের জন্য জায়গা প্রয়োজন এবং অস্থায়ীভাবে দাফন করা মরদেহগুলো স্থায়ী কবরস্থানে স্থানান্তর করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খান ইউনিস কবরস্থানের কবর খননকারী তাফেশ আবু হাতাব বলেন, যুদ্ধের আগে সেখানে প্রায় ৬০টি কবর ছিল। এখন কবরের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার। যুদ্ধের এক পর্যায়ে তাকে দিনে প্রায় ৩৫টি পর্যন্ত কবর প্রস্তুত করতে হয়েছে।

তার ভাষায়, যুদ্ধের পুরো সময়ে এমন ভয়াবহ রক্তপাত তারা আগে কখনো দেখেননি। প্রতিদিনই বহু মৃতদেহ দাফন করতে হচ্ছে। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাও অনেক।

গাজার ধ্বংসযজ্ঞে অনেক সময় পুরো পরিবার একসঙ্গে প্রাণ হারাচ্ছে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ি, গাড়ি কিংবা তাঁবুর ধ্বংসস্তূপ থেকেই পরে তাদের জন্য কবর তৈরি করতে হচ্ছে। ফলে যুদ্ধ শুধু জীবিতদের বাসস্থানই কেড়ে নেয়নি, মৃতদের শেষ আশ্রয়ের জায়গাটিও সংকুচিত করে দিয়েছে।

সম্পাদক ও প্রকাশক | উইনিং গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান।

© 2026 মুখপত্র। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।