মুখপত্র
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০১ নভেম্বর, ২০২৬, ০৫:৫৩ এএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ০৬:৪৮ পিএম

তালেবান শাসনের নারীদের জীবন, নিষেধাজ্ঞা ও বদলে যাওয়া বাস্তবতা

আন্তর্জাতিক
Sub Editor
তালেবান শাসনের নারীদের জীবন, নিষেধাজ্ঞা ও বদলে যাওয়া বাস্তবতা
১৮ বছর বয়সী এক তরুণী বিবাহবিচ্ছেদের পক্ষে নিজের বক্তব্য তুলে ধরে বলেন, “আমার সম্মান ও মর্যাদা এরই মধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। ছবি/ বিবিসি

আফগানিস্তানে তালেবান দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পর দেশটির নারীদের জীবন ও স্বাধীনতায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে মেয়েদের বাদ দেওয়া হয়েছে। নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও অধিকাংশ কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের সুযোগও বন্ধ বা সীমিত করা হয়েছে।

পাশাপাশি একা ভ্রমণ এবং পার্ক ও বিনোদনকেন্দ্রে যাওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে বিধিনিষেধ। 

BBC-এর দুই বছরের অনুসন্ধান ও সাক্ষাৎকারে তালেবান সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, সাবেক যোদ্ধা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাওয়া যায়। এসব সাক্ষাৎকারে তালেবান শাসনের অভ্যন্তরীণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে শাসকদের সম্পর্কের নানা দিক উঠে এসেছে। 

স্বামীর নির্যাতনের অভিযোগ, তালেবান গভর্নরের কাছে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন

জাওজান প্রদেশের গভর্নর আবদুল্লাহ সারহাদির কার্যালয়ে ১৮ বছর বয়সী এক তরুণী তার স্বামীর বিরুদ্ধে কয়েক মাস ধরে মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগ তুলে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন। নিরাপত্তার কারণে প্রতিবেদনে তার আসল নাম প্রকাশ করা হয়নি; তাকে ‘তুবা’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে।

তরুণীটি গভর্নরকে জানান, তিনি আর স্বামীর সঙ্গে সংসার করতে চান না এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। গভর্নর তাকে সংসার টিকিয়ে রাখার পরামর্শ দেন এবং বিবাহবিচ্ছেদের পর ভবিষ্যতে অন্য কেউ তাকে বিয়ে করবে কি না—এমন প্রশ্নও তোলেন। কিন্তু তরুণী জবাব দেন, তার সম্মান ও মর্যাদা এরই মধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। 

বিবাহবিচ্ছেদের আর্থিক বিষয় নিয়েও বিরোধ দেখা দেয়। শরিয়াহ অনুযায়ী, কোনো নারী স্বামীর সম্মতিতে বিবাহবিচ্ছেদ চাইলে বিয়ের সময় স্বামীর দেওয়া অর্থের কিছু অংশ বা পুরোটা ফেরত দেওয়ার বিষয় থাকতে পারে। ওই নারীর স্বামী পরিবারের কাছে নির্ধারিত অর্থের চার গুণ দাবি করেন, যা তার পরিবার দিতে রাজি হয়নি। 

শেষ পর্যন্ত ওই তরুণীর বাবা জানান, পরিবার আদালতের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদের চেষ্টা করবে। তবে তালেবান পরিচালিত আদালত ব্যবস্থায় স্বামীর সম্মতি ছাড়া নারীর বিবাহবিচ্ছেদ পাওয়া অত্যন্ত কঠিন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

তালেবান গভর্নরের অতীতও উঠে এসেছে

আবদুল্লাহ সারহাদি তালেবানের প্রথম শাসনামলেও সামরিক কমান্ডার ছিলেন। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোট তালেবান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর তিনি আত্মসমর্পণকারী হাজারো বিদ্রোহীর একজন ছিলেন। পরে তাকে কয়েক বছর গুয়ানতানামো বে-তে মার্কিন হেফাজতে রাখা হয়। 

তালেবান ২০২১ সালে আবার ক্ষমতায় ফেরার পর সারহাদি প্রথমে বামিয়ান এবং পরে জাওজান প্রদেশের গভর্নর হন। পরবর্তীতে তিনি উত্তরাঞ্চলীয় কুন্দুজ প্রদেশে একটি সামরিক কোরের উপ-প্রধানের দায়িত্ব পান। 

বামিয়ানে তালেবানের হাতে ঐতিহাসিক বুদ্ধমূর্তি ধ্বংসের প্রসঙ্গ উঠলে সারহাদি দাবি করেন, তিনি নিজ হাতে সেগুলো ধ্বংস করেছিলেন। এ কাজ নিয়ে অনুশোচনা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তালেবান যা করেছে ও করছে, তা তাদের ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও বিশ্বাস অনুযায়ী করা হয়েছে। 

আত্মঘাতী হামলার সঙ্গে জড়িত সাবেক কমান্ডার এখন সরকারি কর্মকর্তা

কাবুলে BBC আরেক তালেবান কর্মকর্তা হাবিবুল্লাহ বদরের সঙ্গে কথা বলে। তিনি সশস্ত্র সংঘাতের সময় কাবুলে আত্মঘাতী হামলাকারীদের পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন বলে জানান। শহরের বিভিন্ন রাস্তা ও অলিগলি সম্পর্কে তার বিস্তারিত তথ্য ছিল এবং হামলার পরিকল্পনায় দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি নেওয়া হতো বলে তিনি জানান। 

তালেবানের আত্মঘাতী হামলায় আফগানিস্তানে হাজারো মানুষ নিহত হন, যাদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিকও ছিলেন। অতীতের নির্দিষ্ট হামলা ও বেসামরিক মৃত্যুর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বদর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সরাসরি উত্তর এড়িয়ে যান। 

তিনি বর্তমানে চিকিৎসার জন্য সরকারি দায়িত্ব থেকে সাময়িক বিরতিতে আছেন। এর আগে তিনি পুরো দেশের কারা বিভাগের উপপ্রধান ছিলেন এবং যে কারাগারে একসময় পূর্ববর্তী সরকারের অধীনে মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় বন্দি ছিলেন, সেটির দায়িত্বও পালন করেছেন। 

মেয়েদের স্কুল খুলে দেওয়ার দাবি উঠতেই নীরবতা

এক অনুষ্ঠানে বদরকে সম্মাননা দেওয়ার সময় সুলতান মোহাম্মদ তালেয়ি প্রকাশ্যে মেয়েদের জন্য স্কুল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য জ্ঞান অর্জন করা ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তার বক্তব্যের পর অনুষ্ঠানে অস্বস্তিকর নীরবতা তৈরি হয় এবং তার মাইক্রোফোন সরিয়ে নেওয়া হয়। 

পরবর্তীতে তালেয়ি BBC-কে জানান, মেয়েদের স্কুল পুনরায় চালু করার দাবি জানিয়েছিলেন তিনি। আরও কিছু কথা বলতে চাইলেও তাকে বেশি কথা বলতে দেওয়া হয়নি বলে জানান। 

নারীদের প্রতিবাদ ও সাংবাদিকদের ওপর চাপ

প্রতিবেদনে বলা হয়, তালেবান শাসনের বিভিন্ন বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে অনেকেই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। কয়েকজন নারী জানান, শিক্ষা ও অন্যান্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে তারা গভীর হতাশায় ভুগছেন। কেউ কেউ জানিয়েছেন, প্রতিবাদ করার কারণে তাদের পরিচিত নারীদের কারাগারেও পাঠানো হয়েছে। 

এ ছাড়া BBC-এর সঙ্গে কথা বলা বেশিরভাগ সাংবাদিক জানিয়েছেন, তাদের তালেবানের গোয়েন্দা সংস্থা ‘এস্তিখবারাত’ তলব করেছে বা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। 

নারীদের অধিকার নিয়ে তালেবানের বক্তব্য

তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেন, নারীদের অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে শরিয়াহর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। নারীরা তার মতো সরকারি দপ্তরে কাজ করলে অনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এবং তাদের মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও তিনি দাবি করেন। 

মেয়েদের শিক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে এবং শরিয়াহভিত্তিক সমাধান প্রয়োজন। একইভাবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও আফগানিস্তানে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকার কথা স্বীকার করেন তিনি। 

কান্দাহারে আরও কঠোর বিধিনিষেধ

তালেবানের শীর্ষ নেতৃত্বের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কান্দাহারে বিধিনিষেধ আরও কঠোর হয়েছে বলে BBC-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সেখানে পুরুষদের দাড়ি রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। রেডিও স্টেশনগুলোতে গান বাজানো এবং নারীদের কণ্ঠ সম্প্রচারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। 

তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার সঙ্গে সাক্ষাৎকারের জন্য BBC আবেদন করলেও তা সম্ভব হয়নি। তিনি খুব কমই জনসম্মুখে আসেন এবং গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকারও দেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক সংকটও বড় সমস্যা

তালেবানের সাবেক যোদ্ধাদের পুরোনো গোপন গুহা ও যুদ্ধের সময়কার অবস্থানও BBC-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা পানি, রাস্তা ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মতো মৌলিক সুবিধার প্রয়োজনের কথা জানিয়েছেন। 

তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পরও আফগানিস্তানে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। তালেবান কর্মকর্তারা এসব সমস্যা সমাধানে কাজ করার দাবি করলেও দেশটির অনেক মানুষ মনে করেন, তালেবান শাসনই তাদের প্রধান সমস্যা। 

এক নারী অধিকারকর্মী, যিনি নিরাপত্তার কারণে ‘হোদা’ নামে পরিচিত, বলেন—নারীরা বর্তমান পরিস্থিতি মেনে নিতে পারছেন না। তার মতে, তালেবান যতই বিধিনিষেধ বাড়াক, এই পরিস্থিতি চিরস্থায়ী হবে না। তিনি আরও বলেন, তালেবান শিক্ষিত নারীদের ভয় পায় এবং সে কারণেই নারীদের শিক্ষার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হচ্ছে। 
 

সম্পাদক ও প্রকাশক | উইনিং গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান।

© 2026 মুখপত্র। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।