ফাতিমা আল-আশকার খেলনা ব্যবহার করে তাঁর সন্তানদের বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, তাদের বাবা নিহত হয়েছেন। তিনি খেলনা সৈন্যদের সাজিয়ে একটি কৃত্রিম যুদ্ধের দৃশ্য তৈরি করেন। এরপর একটি খেলনা বিমান হাতে নিয়ে নিচে থাকা প্লাস্টিকের সৈন্যদের ওপর বিমান হামলার অভিনয় করেন।
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের মারকাবা এলাকার ২৬ বছর বয়সী বাসিন্দা আল-আশকার বলেন, ‘আমি তাদের বোঝাতে শুরু করলাম—ইসরায়েল এখানে এসে বোমা হামলা করেছে। বাবা এখানে ছিলেন। বাবা শহীদ হয়েছেন। বাবা ইসরায়েলের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করছিলেন।’
তার স্বামী মোহাম্মদ আলী হিজবুল্লাহ-এর সদস্য ছিলেন। এপ্রিলের শুরুতে ওই অঞ্চলে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় তিনি নিহত হন।
তবে আকস্মিক এই শোক সামলানোর দায়িত্ব একা নিতে হয়নি তরুণ এই বিধবাকে। খুব দ্রুতই হিজবুল্লাহর বিস্তৃত সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থার আওতায় চলে আসেন তিনি।
হিজবুল্লাহর ‘শহীদ ফাউন্ডেশন’ আল-আশকার ও তাঁর সন্তানদের জন্য বৈরুতের দক্ষিণ উপকণ্ঠে একটি বাসা খুঁজে দেয় এবং প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রের ব্যবস্থা করে। বাসার পুরো ভাড়া ফাউন্ডেশনই বহন করছে। পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানের জন্য ভাতা, তাদের স্কুলের খরচ এবং পুরো পরিবারের চিকিৎসা ব্যয়ও দেওয়া হচ্ছে।
মাঝেমধ্যে ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিরা আল-আশকারের বাড়িতে গিয়ে তাঁর ও সন্তানদের সঙ্গে বসেন এবং মানসিক সহায়তার জন্য বিভিন্ন সেশন পরিচালনা করেন।
আল-আশকার বলেন, ‘হিজবুল্লাহ আমাদের পাশে আছে। তারা আমাদের জন্য সবকিছুই করছে।’
গত ১৮ আগস্ট বৈরুতে লেবানন-ইসরায়েল আলোচনা নিয়ে হিজবুল্লাহর সমর্থকদের বিক্ষোভ। ছবি: ওয়ায়েল হামজেহ/ইপিএ
যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়া কিংবা স্বজন হারানো দক্ষিণ লেবাননের আল-আশকার ও অন্য বাসিন্দারা সহায়তার জন্য রাষ্ট্রের কাছে যাননি; বরং তারা হিজবুল্লাহর কাছেই গেছেন। কেউ গেছেন সংগঠনটির প্রতি বিশ্বাস থেকে, আবার কেউ রাষ্ট্রের অনুপস্থিতির কারণে অন্য কোনো বিকল্প না থাকায়।
এদিকে লেবাননের রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ নিজেদের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। কিন্তু দেশটি গভীর বিভাজনের মধ্যে রয়েছে। শুধু হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার বিষয়টিই নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপের মুখে আরও বড় একটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে সরকারকে।
রাষ্ট্রকে হিজবুল্লাহর দীর্ঘদিনের সামাজিক কল্যাণব্যবস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে সংগঠনটির সমর্থকদের বোঝাতে হচ্ছে যে রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। কিন্তু দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের চলমান দখল ও হামলা রাষ্ট্রের সেই দাবি দুর্বল করে দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক যুদ্ধ হিজবুল্লাহকে ঘিরে আগে থেকেই থাকা বিভাজন আরও গভীর করেছে। সংগঠনটির সমর্থকদের অভিযোগ, সরকার ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে এবং ইসরায়েলি হামলার জবাব না দিয়ে লেবাননকে অপমান করছে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহর বিরোধীরা সংগঠনটিকেই যুদ্ধ শুরুর জন্য দায়ী করছে। তাদের দাবি, ২ মার্চ ইসরায়েলে রকেট হামলা চালিয়ে হিজবুল্লাহই ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও বর্তমান দখলদারির পথ তৈরি করেছে।
আল-আশকার বলেন, ‘সত্যি বলতে, রাষ্ট্র নিয়ে আমি চিন্তিত নই। আগে আমরা বলতাম, তারা কথা বলুক, কিছু একটা করুক। এখন তারা কথা বলুক বা না বলুক, তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না।’
২০২৪ সালে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে নামমাত্র যুদ্ধবিরতির সময় তাঁর বাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। এর আগে ২০০০ সালে ইসরায়েল প্রত্যাহার করার আগ পর্যন্ত তাঁর গ্রামটি ইসরায়েলের দখলে ছিল।
শক্তিশালী রাষ্ট্র চান অনেকে
নাবাতিয়েহ শহরের উপকণ্ঠের ৬৬ বছর বয়সী চিকিৎসক মুস্তাফা হামজের মতে, রাষ্ট্র আরও শক্তিশালী হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে। হিজবুল্লাহর অস্ত্র কিংবা সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগ—কোনোটিই তাঁকে নিজের বাড়িতে ফিরতে সাহায্য করেনি। যুদ্ধের শুরুর দিকে তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে আসেন। সর্বশেষ সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করলে একটি ইসরায়েলি ড্রোন তাঁর ওপর হামলা চালায়।
হামজে বলেন, ‘ইসরায়েল বলছে তারা শান্তি চায়—এটা মিথ্যা। কিন্তু হিজবুল্লাহরও যুদ্ধ দরকার। এসব গোষ্ঠী যুদ্ধের মধ্য দিয়েই টিকে থাকে। তাদের অস্ত্র আছে এবং তারা আপনার কাছ থেকে সবকিছু নিয়ে নেয়। তারা একে অপরের মতো।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখানে আর কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন নেই। হিজবুল্লাহ চায় সবাই তাদের সঙ্গে এবং তাদের ছায়ার নিচে থাকুক। অন্য কিছু তারা মেনে নিতে চায় না।’
তবে নিজের অধিকার রক্ষায় লেবাননের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপরও তাঁর খুব বেশি আস্থা নেই। ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর ব্যবস্থায় লেবাননের সেনাবাহিনীও যুক্ত রয়েছে। সেই বাহিনীর মাধ্যমে বাড়িতে যাওয়ার জন্য নিরাপদ পথের আবেদন করেছেন তিনি। কিন্তু এখনো কোনো অনুমতি পাননি।
লেবাননের কর্মকর্তারা জানেন, জনগণ—বিশেষ করে হিজবুল্লাহর সমর্থকদের—রাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখতে রাজি করানো তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে লেবাননের এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি পুরো সরকারকে নিয়ে সমন্বিতভাবে করতে হবে। হিজবুল্লাহর সমর্থকদের ক্ষেত্রে আপনি তিন প্রজন্মের সামাজিকভাবে গড়ে ওঠা বিশ্বাসের কথা বলছেন। প্রথমে সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করতে হবে, এরপর সরকারে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। তারপর নিরাপত্তার বিষয়ে কথা বলা যাবে।’
তিনটি ‘পাইলট জোনে’ আস্থা ফেরানোর চেষ্টা
ইসরায়েলি দখল থেকে লেবাননের সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা তিনটি ‘পাইলট জোন’কে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে লেবানন সরকার। এসব এলাকাকে ভবিষ্যতের জন্য পরীক্ষামূলক মডেল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ইসরায়েলি গোলাবর্ষণে বেশিরভাগ এলাকা ধ্বংস হয়ে গেলেও পুনর্গঠন করা হচ্ছে আগের যুদ্ধগুলোর তুলনায় ভিন্ন পরিকল্পনায়। লেবাননের সেনাবাহিনী দক্ষিণাঞ্চলীয় কাউন্সিলকে পুনর্গঠনের কাজ করতে দিচ্ছে না। এই সরকারি সংস্থাটি হিজবুল্লাহ-সমর্থিত আমাল আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এবং অতীতে পুনর্গঠনের কাজে তারা ভূমিকা রেখেছিল।
এর পরিবর্তে রাস্তা পুনর্নির্মাণ ও অবকাঠামো সংস্কারের দায়িত্ব নিয়েছে লেবাননের সেনাবাহিনী। নিরাপত্তা কর্মকর্তার মতে, এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের উপস্থিতি মানুষের সামনে দৃশ্যমান হবে এবং নাগরিকরা হিজবুল্লাহর পরিবর্তে বৈরুতের সরকারের দিকে ফিরবে।
একই সঙ্গে পাইলট জোন চুক্তির অধীনে সেনাবাহিনী তার দায়িত্বও পালন করতে পারবে। কারণ অবকাঠামো নির্মাণের প্রকল্পগুলো যেন সামরিক কাজে ব্যবহার না হয়, তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তবে ইসরায়েল যখনই লেবাননের ভূখণ্ডে হামলা চালায় এবং রাষ্ট্র তার জবাব দিতে ব্যর্থ হয়, তখনই সরকারের এই অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। এমন হামলা দিনে কয়েকবারও ঘটছে।
গত সপ্তাহে তিনটি পাইলট জোনের একটি—জাওতার আল-গারবিয়াহর কাছেই—ইসরায়েলি সেনারা পূর্ব জাওতারের পৌর ভবন, একটি সরকারি স্কুল ও একটি ক্লিনিক ধ্বংস করে।
১৩ আগস্ট জাওতার আল-গারবিয়াহ গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত একটি মসজিদ। ছবি: ওয়ায়েল হামজেহ/ইপিএ
হিজবুল্লাহর সামাজিক সহায়তার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না রাষ্ট্র
অর্থনৈতিকভাবে সংকটে থাকা লেবাননের রাষ্ট্র হিজবুল্লাহর বিস্তৃত সামাজিক সেবা ব্যবস্থার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না।
সীমান্তবর্তী আইতারুন গ্রামের বাস্তুচ্যুত বাসিন্দা টিয়া আবদালাহ বলেন, ‘আমরা হিজবুল্লাহ ও তাদের সহযোগী সহায়তা সংস্থা সামিদুনের কাছ থেকে চিকিৎসা, বিনামূল্যে ওষুধ ও রক্ত পরীক্ষা পেয়েছি। রাষ্ট্রের কাছ থেকে আমরা কিছুই পাইনি। আর সেনাবাহিনীর হাতও সরকারের কারণে বাঁধা ছিল।’
তিনি হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও জানান, সংগঠনটি তাঁর পরিবারকে প্রতি মাসে নগদ অর্থের সহায়তা দিয়েছে এবং বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রীও দিয়েছে।
লেবাননের কর্মকর্তারা ইসরায়েলি হামলা বন্ধ করার ক্ষেত্রে নিজেদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত। তারপরও তারা কূটনৈতিক প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তবে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনাদের প্রত্যাহার না হলে রাষ্ট্রের বৈধতা ও জনগণের আস্থা ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
ওই নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রত্যাহারের একটি স্পষ্ট সময়সূচি না থাকলে পাইলট জোনগুলো কাজ করবে না। আমরা হিজবুল্লাহকে সরিয়ে দিতে চাই। কিন্তু একই সঙ্গে এমন দেখাতেও চাই না যে আমরা দক্ষিণ লেবাননের সেনাবাহিনীর ভূমিকা পালন করছি।’
দক্ষিণ লেবাননে ১৯৮০-এর দশক থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলি দখলদারিত্বে সহযোগিতা করা তাদের স্থানীয় মিত্র বাহিনী ‘সাউথ লেবানন আর্মি’র কথা উল্লেখ করেই তিনি এ মন্তব্য করেন।
আল-আশকারের মতো মানুষের কাছে, যাদের স্বামী ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লেবাননকে রক্ষার লড়াইয়ে নিহত হয়েছেন বলে তারা মনে করেন, রাষ্ট্র নিরাপত্তার বিষয়ে খুব সামান্যই আশার কথা বলতে পারে।
আল-আশকার বলেন, ‘ইসরায়েল সেনাবাহিনীকে ফোন করে বলে, “গ্রাম ছেড়ে চলে যাও।” তখন তারা গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। এরপর সেখানে গ্রামকে রক্ষা করার মতো কেউ থাকে না… কখনো কখনো মনে হয়, তারা ইসরায়েলিদের হয়ে কাজ করছে।’