১১ সেপ্টেম্বর, ২৫ বছর আগে, ওসামা বিন লাদেন আল-কায়েদার কয়েকজন সদস্য ও সহযোগীকে নিয়ে পূর্ব আফগানিস্তানের একটি দুর্গম এলাকায় যান। তার এসইউভির বহরের সঙ্গে ছিল একটি মিনিভ্যান, যেটিকে অস্থায়ী যোগাযোগকেন্দ্রে রূপ দেওয়া হয়েছিল।
ভ্যানটির সীমিত সরঞ্জামের কারণে বিন লাদেন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো ১৯ সদস্যকে নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার ও ওয়াশিংটন ডিসির কাছে পেন্টাগনে বিমান হামলা চালাতে দেখতে পারেননি। তবে হতভম্ব রেডিও ঘোষকদের মুখে তিনি হামলার খবর শুনছিলেন। ওই হামলায় প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হন।
হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াকে বৈশ্বিক ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করেন। পরে এই কৌশলকে অনেকেই ভুল, অনুপযুক্ত ও বিপরীতমুখী সিদ্ধান্ত হিসেবে আখ্যা দেন।
এই সময় মাটিতে থেকে ঘটনাগুলো কাভার করা সাংবাদিকদের কাছে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ ভুল ও ব্যর্থতাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আফগানিস্তানের পাহাড়ে মার্কিন বোমারু বিমান, বাগদাদের রাস্তায় ট্যাংক এবং আত্মঘাতী হামলাকারী ও উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর হামলার শিকার মানুষদের সাক্ষাৎকার—সব মিলিয়ে যুদ্ধের ভয়াবহ চিত্র সামনে আসে।
এই নজিরবিহীন ধারাবাহিক সামরিক অভিযানের ফলে আফগানিস্তান ও ইরাকে আগ্রাসন, নির্যাতন, বন্দিদের গোপন হস্তান্তর এবং বিতর্কিত শাসকদের সঙ্গে জোট গঠনের মতো ঘটনা ঘটে। এতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং লাখো মানুষ দুর্ভোগে পড়ে।
প্রশ্ন হলো, বিন লাদেন কি এমন পরিণতিই চেয়েছিলেন?
প্রায়ই বলা হয়, ৯/১১ হামলার মাধ্যমে বিন লাদেন যুক্তরাষ্ট্রকে এমন যুদ্ধে জড়াতে চেয়েছিলেন, যা দেশটির অর্থনীতিকে দুর্বল করে শেষ পর্যন্ত পতনের দিকে ঠেলে দেবে। অনেকটা আফগানিস্তানে ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সালের যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন যেভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল, তেমনই কিছু ঘটবে বলে ধারণা করা হয়।
তবে এই ধারণার পক্ষে খুব বেশি প্রমাণ নেই। বিন লাদেন আগের আফগান যুদ্ধ থেকে অনুপ্রাণিত হলেও তার সহযোগীদের সতর্কবার্তা—হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে সেনা পাঠাতে পারে—তিনি বাস্তবসম্মত মনে করেননি। বরং তিনি সম্ভবত মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মতো সীমিত প্রতিশোধ আশা করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা সত্যিই আফগানিস্তানে যাওয়ার পর আল-কায়েদার হাতে কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল না।
বাস্তবে বিন লাদেনের কৌশল ছিল ভিন্ন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে বাধ্য করতে চেয়েছিলেন। ২০০৪ সালে তিনি দাবি করেছিলেন, আল-কায়েদা যুক্তরাষ্ট্রকে দেউলিয়াত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং সংগঠনটি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যে এক ডলার ব্যয় করেছে, তার বিপরীতে ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক ক্ষতি ও সামরিক ব্যয় হয়েছে এক মিলিয়ন ডলার।
তবে তার এই হিসাব ছিল অত্যন্ত আশাবাদী। ৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রে আর কোনো বড় ধরনের সফল হামলা চালাতে পারেনি আল-কায়েদা। এটিকে ৯/১১-পরবর্তী মার্কিন নীতির অন্যতম বড় সাফল্য এবং আল-কায়েদার বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রও সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো ভেঙে পড়েনি এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে নিজেদের বাহিনী প্রত্যাহার করেনি।
বিন লাদেনের দ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যের শাসকদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন বন্ধ করা। সৌদি বংশোদ্ভূত এই বিদ্রোহী নিজ দেশের শাসক পরিবারসহ ওই অঞ্চলের অনেক শাসককে ঘৃণা করতেন।
২০০১ সালের পর তার পছন্দের কয়েকজন শাসকের পতন ঘটলেও তা বিন লাদেনের কর্মকাণ্ড বা তার আদর্শ অনুসারীদের কারণে হয়নি। মুয়াম্মার গাদ্দাফি পশ্চিমা সমর্থিত বিদ্রোহীদের হাতে ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হন। সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করে যুক্তরাষ্ট্র। আর সিরিয়ায় আসাদ পরিবারের শাসনের অবসান ঘটান আল-কায়েদার সাবেক এক সদস্য, যিনি সংগঠনটির আদর্শ ও কর্মসূচি থেকে প্রকাশ্যে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন।
বিন লাদেনের তৃতীয় লক্ষ্য ছিল প্রচার। তার সন্ত্রাসের কৌশল ছিল রক্তাক্ত, ব্যাপক ও স্মরণীয় হামলার মাধ্যমে অনুসারীদের উগ্রপন্থী করে তোলা, নতুন সদস্য আকৃষ্ট করা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা।
৯/১১ হামলা আন্তর্জাতিকভাবে মুসলিমদের ওপর পশ্চিমা বিশ্বের কথিত নিপীড়নের বিষয়ে বিন লাদেনের প্রচারকে সামনে আনলেও এতে ভুক্তভোগীদের পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি হয়নি। ২০০১ সালের কয়েক বছর পর বিন লাদেন ও উগ্র ইসলামপন্থীদের প্রতি সমর্থন দ্রুত কমতে শুরু করে।
২০১১ সালে পাকিস্তানে মার্কিন নেভি সিলের অভিযানে নিহত হওয়ার কিছুদিন আগে বিন লাদেন আল-কায়েদার ভাবমূর্তি নতুন করে গড়ে তোলার কথা ভাবছিলেন। মুসলিম বিশ্বে বিপুলসংখ্যক মুসলিম হত্যার জন্য আল-কায়েদার বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা সমালোচনাই এর অন্যতম কারণ ছিল।
তার উত্তরসূরি মিশরীয় আয়মান আল-জাওয়াহিরি পরবর্তীতে বৈশ্বিক বিদ্রোহের ধারণা থেকে সরে গিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেন।
২০১৪ সালে ইরাক ও সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট বা আইএস যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও অন্যান্য বিশৃঙ্খলাকে কাজে লাগিয়ে ভয়াবহ খেলাফত প্রতিষ্ঠা করলেও ২০১৯ সালের মধ্যেই সেটির পতন ঘটে।
এরপর থেকে বিন লাদেনের আদর্শে পরিচালিত উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম মূলত মুসলিম বিশ্বের প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। আল-কায়েদা ও আইএস সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করেছে সাব-সাহারান আফ্রিকায়। সেখানে তারা অরাজকতা, ব্যর্থ রাষ্ট্রব্যবস্থা, জনসংখ্যাগত চাপ, সীমিত সম্পদ নিয়ে সাম্প্রদায়িক প্রতিযোগিতা এবং পশ্চিমা বিশ্বের উদাসীনতাকে কাজে লাগিয়েছে।
কিছু বিশ্লেষক সোমালিয়া বা মালির মতো দেশে আল-কায়েদার সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত গোষ্ঠীগুলোর সদস্যসংখ্যা একত্র করে দাবি করেন, তাদের সংখ্যা ২০০১ সালে বিন লাদেনের অনুসারীদের চেয়েও বেশি। কিন্তু এসব সংগঠনের কয়েক হাজার সদস্যের সঙ্গে ২৫ বছর আগে বিন লাদেনের নেতৃত্বাধীন আল-কায়েদার লক্ষ্য ও সক্ষমতার খুব কমই মিল রয়েছে।
বিন লাদেনের বিকৃত আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এখনো ভয়াবহ হামলা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এমন হামলা ঘটতে পারে। তার সহিংসতা ও এর প্রতিক্রিয়ায় তৈরি মেরুকরণও এর একটি কারণ।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আল-কায়েদা বা আইএস—কোনো সংগঠনেরই এখন বিন লাদেনের মতো প্রভাবশালী ও আকর্ষণীয় নেতা নেই। এর একটি কারণ, এমন কোনো নেতাকে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত হত্যা করতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি, এমন ব্যক্তির পক্ষে এখন আর অতীতের মতো বড় অনুসারী গোষ্ঠী তৈরি করাও সম্ভব হচ্ছে না।
প্রায়ই বলা হয়, কোনো বিদ্রোহী বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর জয়ী হওয়ার জন্য শুধু টিকে থাকাই যথেষ্ট। আল-কায়েদার এখনও টিকে থাকা সংগঠনটির জন্য এবং মৃত্যুর পরও এর প্রতিষ্ঠাতা বিন লাদেনের জন্য এক ধরনের অর্জন হতে পারে। তবে একে কোনোভাবেই বিজয় বলা যায় না।