জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে কুমিল্লা সফরে গিয়ে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে বেড়ানোর অভিযোগ উঠেছে।
নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী ১০ অক্টোবর প্রতিযোগিতার সমাপনী অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই তারা রাজশাহীতে ফিরে আসেন বলে জানা গেছে।
এদিকে সরকারি সফরের খরচ দেখিয়ে বোর্ডের ক্রীড়া তহবিল থেকে অগ্রিম দেড় লাখ টাকা তোলার বিষয়টি সামনে আসার পর অর্থ ব্যয়ের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বোর্ডের সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গ্রীষ্মকালীন জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা-২০২৬-এর চূড়ান্ত পর্বে অংশ নিতে কর্মকর্তাদের সফরসূচি নির্ধারণ করা হয়েছিল। ৬ অক্টোবর কুমিল্লার শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পর ৭ থেকে ৯ অক্টোবর কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে অবস্থান এবং ১০ অক্টোবর সমাপনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে রাজশাহীতে ফেরার পরিকল্পনা ছিল তাদের।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরদিন ৭ অক্টোবর সকালে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শামীম আরা চৌধুরীসহ একদল কর্মকর্তা দুটি মাইক্রোবাসে করে পাহাড়ি অঞ্চলের উদ্দেশে যাত্রা করেন। ওই দিন দুপুরে তারা সাজেকে পৌঁছান। পরে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন পর্যটনস্থল ঘুরে খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউসে রাত কাটান।
সফরসঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ইফফাত জেরীন, কলেজ পরিদর্শক মাহবুব হাসান, বিদ্যালয় পরিদর্শক শামীম হাসান, উপপরিচালক (হিসাব ও নিরীক্ষা) মো. ইব্রাহিম এবং প্রোগ্রামার মাইনুল অর রশিদসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
সাজেক ভ্রমণের একটি ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রের দাবি, ৮ অক্টোবর সকালে চেয়ারম্যানসহ সফরসঙ্গীরা খাগড়াছড়ি থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। ওই রাতে তারা ঢাকায় শিক্ষা বোর্ডের অতিথিশালায় থাকেন। পরদিন ৯ অক্টোবর সকালে দুই দফায় তারা রাজশাহীর উদ্দেশে যাত্রা করেন। একটি দল সকাল ৭টায় এবং অন্য দল সকাল সাড়ে ১০টায় রওনা হয়।
দেড় লাখ টাকার ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন
বোর্ডের একটি সূত্রের দাবি, সরকারি সফরের ব্যয় নির্বাহের জন্য ক্রীড়া তহবিল থেকে অগ্রিম দেড় লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। তবে এই অর্থ কোন কোন খাতে খরচ হয়েছে, তার বিস্তারিত হিসাব পাওয়া যায়নি। পাহাড় ভ্রমণের সঙ্গে ওই অর্থের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা-ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য, জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সাধারণত চেয়ারম্যান, সচিব, বিদ্যালয় পরিদর্শক ও ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেন। তবে এবারের সফরে ক্রীড়া বিভাগের কোনো কর্মকর্তাকে না নিয়ে অন্যান্য বিভাগের একাধিক কর্মকর্তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সফরসঙ্গী নির্বাচনের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এদিকে চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন কর্মকর্তা কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় বোর্ডের সচিব অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রউফকে নিজের দায়িত্বের পাশাপাশি চেয়ারম্যানের রুটিন দায়িত্ব এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, হিসাব ও নিরীক্ষা, বিদ্যালয় ও কলেজ পরিদর্শক বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে বলে জানা গেছে।
এর ফলে বোর্ডের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটেছে এবং সেবা নিতে আসা ব্যক্তিদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পাহাড় ভ্রমণের অভিযোগ অস্বীকার চেয়ারম্যানের
অভিযোগের বিষয়ে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শামীম আরা চৌধুরী পাহাড় ভ্রমণের কথা অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, তিনি কুমিল্লা শহরের আশপাশের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা পরিদর্শন করেছেন।
তবে প্রতিবেদনে সফরে অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তার বক্তব্যের বরাত দিয়ে চেয়ারম্যানসহ অন্যদের পাহাড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সাজেক ভ্রমণের ভিডিও প্রকাশকারী উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জাহিদুর রহিমের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থাকতে পারে এবং কেউ ঘুরতে যেতে পারেন।
কলেজ পরিদর্শক মাহবুব হাসান পাহাড় ভ্রমণের বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি অফিসে গিয়ে কথা বলার পরামর্শ দেন। তবে ১০ অক্টোবর সমাপনী অনুষ্ঠান হওয়ার কথা থাকলেও তারা ৯ অক্টোবর রাজশাহীতে ফিরে এসেছেন বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রউফ বলেন, কর্মকর্তারা কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গেছেন বলেই তিনি জানতেন। তাদের সেখানে অবস্থান করার কথা ছিল।
তিনি জানান, কর্মকর্তারা যদি তার অজান্তে পাহাড় ভ্রমণে গিয়ে থাকেন, তাহলে বিষয়টি দুঃখজনক। এ বিষয়ে তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। জবাব সন্তোষজনক না হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।