মুখপত্র
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০১ নভেম্বর, ২০২৬, ০৫:১১ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০১ নভেম্বর, ২০২৬, ০৭:০২ এএম

শুধু সরকার পরিবর্তনে মৌলিক সমস্যার সমাধান মেলে না: বিশ্লেষকরা

জাতীয়
নিজস্ব প্রতিবেদক
শুধু সরকার পরিবর্তনে মৌলিক সমস্যার সমাধান মেলে না: বিশ্লেষকরা

কেবল সরকার পরিবর্তন বা গণ-অভ্যুত্থান মানুষের মৌলিক সংকটগুলোর স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন অর্থনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন এবং তৃণমূল পর্যায় থেকে গড়ে ওঠা অংশগ্রহণমূলক সাংগঠনিক ভিত্তি। গত শনিবার সন্ধ্যায় বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রহমান সেমিনার কক্ষে ‘বৈশ্বিক গণ-আন্দোলনের অভিমুখীনতা’ শীর্ষক এক আলোচনায় বক্তারা এসব অভিমত ব্যক্ত করেন। ‘যৌথ পাঠ ধ্রুপদি সাহিত্যের পাঠচক্র’ এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদারের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সৈয়দ নিজার এবং পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অর্ক ভাদুড়ী।

আলোচক আলতাফ পারভেজ বলেন, ইউরোপের দেশগুলোতে বর্তমানে যে আন্দোলন চলছে, তাকে কেবল তারুণ্যের বিদ্রোহ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অসন্তোষ এবং জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির মতো বিষয়। তিনি অভিযোগ করেন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গণপরিবহন ও আবাসনের মতো জনকল্যাণমূলক খাতে বিনিয়োগ না বাড়িয়ে সরকারগুলো সামরিক সরঞ্জাম ও করপোরেট স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে শ্রমজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বাংলাদেশের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করে বলেন, দেশে গণ-অভ্যুত্থান হলেও শ্রমজীবীদের মৌলিক সমস্যাগুলো এখনো আলোচনার কেন্দ্রে আসেনি। এর মূল কারণ হিসেবে তিনি বাংলাদেশের সংগঠনগুলোর ‘টপ-ডাউন’ বা ওপর থেকে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার পদ্ধতির সমালোচনা করেন, যা স্থানীয় মানুষের দাবিকে গুরুত্ব দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। আন্দোলনের আরেকটি দিক তুলে ধরে আলতাফ পারভেজ বলেন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান এবং নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার বিরুদ্ধেও মানুষ প্রতিবাদ করছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ের মানুষের সমস্যা ও দাবি সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এজেন্ডায় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা বলেন, ইউরোপের দেশগুলোতে নব্য উদারনৈতিক অর্থনীতি এবং যুদ্ধের ব্যয়ভার সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার কারণে জনরোষ তৈরি হয়েছে। তিনি বাংলাদেশে শ্রমজীবীদের আবাসনসংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, আয়ের তুলনায় আবাসন ব্যয় অনেক বেশি হওয়ার পরও এ নিয়ে কার্যকর আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। মোশাহিদার মতে, বামপন্থী সংগঠনগুলোকে সাধারণ মানুষের বাস্তব প্রয়োজনের আরও কাছাকাছি পৌঁছাতে হবে। তিনি আন্দোলনকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকটের অংশ হিসেবে দেখার আহ্বান জানান।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিক অর্ক ভাদুড়ী দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার গণ-অভ্যুত্থান এই অঞ্চলে বড় ধরনের পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছে। তবে শুধু পুরোনো ব্যবস্থা ভেঙে ফেলাই যথেষ্ট নয়, বরং নতুন রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে পুরোনো ব্যবস্থা নতুন মোড়কে ফিরে আসতে পারে। ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের সাথে শ্রমিক সংগঠনের সংহতি এবং আন্দোলনের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, মানুষ কেবল অর্থের জন্য নয়, সমাজে নিজের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্যও লড়াই করে। এসব অভ্যুত্থানের তাৎক্ষণিক ফল প্রত্যাশা পূরণ না করলেও ভবিষ্যতের আন্দোলনের ক্ষেত্র তৈরি করে।

সবশেষে বক্তারা একমত হন যে, রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। একটি বহুত্ববাদী সমাজে সব মতের ও শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করলে টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয়। স্থানীয় কমিউনিটির সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের সঠিক পুনর্বিন্যাসই পারে মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান করতে। এই আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সময়োপযোগী ও কার্যকর কৌশল নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়।

সম্পাদক ও প্রকাশক | উইনিং গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান।

© 2026 মুখপত্র। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।