মুখপত্র
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ০৩:২৩ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ০১:০০ পিএম

চট্টগ্রামে গণসংযোগে পিস্তলধারীর পরিচয় এক বছরেও অজানা

জাতীয়
নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রামে গণসংযোগে পিস্তলধারীর পরিচয় এক বছরেও অজানা

চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার খন্দকারপাড়া এলাকায় গত বছরের ৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় এক নৃশংস ঘটনা ঘটে। নির্বাচনী প্রচারণার ভিড়ে পেছন থেকে পিস্তল ঠেকিয়ে সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলা নামের এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেই ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্তে এখনো কোনো কূলকিনারা হয়নি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ভিডিও ফুটেজে দেখা যাওয়া সেই বাঁহাতি শুটার কে এবং কোথায় রয়েছে, তা এখনো শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। গুলি করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সরোয়ার হত্যা মামলায় গত ২৮ অক্টোবর আদালত তাঁর দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এ কারণে সরোয়ার সতর্কভাবে চলাফেরা করতেন। নিজের এলাকায় এমন হামলার আশঙ্কা করেননি সরোয়ার। এর পর থেকে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুজনের বিরোধ চলছিল। এ জন্য নির্বাচনী জনসংযোগের মতো জনসমাগমপূর্ণ স্থানকে বেছে নেওয়া হয়। তাঁর ভাষায়, ‘এক ঢিলে দুই পাখি’ মারার মতো ঘটনা ঘটেছে।

ঘটনার সময় চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ নির্বাচনী গণসংযোগে প্রচারপত্র বিলি করছিলেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সরোয়ার হোসেন। হঠাৎ কয়েক রাউন্ড গুলিতে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয় এবং সরোয়ার গুরুতর আহত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় প্রার্থী এরশাদ উল্লাহসহ পাঁচজন আহত হয়েছিলেন। বর্তমানে এরশাদ উল্লাহ সংসদ সদস্য এবং নগর বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের ভিড়ের মধ্যেই হঠাৎ গুলির শব্দ। স্লোগান ও প্রচারপত্র বিতরণের মধ্যে সরোয়ারও প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর পাশে ছিলেন। পরে গুরু-শিষ্যের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। বিষয়টি বিএনপির কিছু নেতা ভালোভাবে নেননি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া ওই শুটারের বয়স আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। হামলাটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং ওই ব্যক্তি সম্ভবত প্রশিক্ষিত কোনো অস্ত্রধারী। ঘটনাস্থলের আশেপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকায় এবং পরিকল্পিতভাবে স্থান নির্বাচন করায় শুটারের পরিচয় উদ্ধার করা পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রটিও এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পুলিশের ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

নিহত সরোয়ার হোসেন পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ছিলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজিসহ মোট ১৫টি মামলা ছিল।

সরোয়ারের বাবা আবদুল কাদেরের ভাষ্যমতে, হত্যাকাণ্ডের তিন দিন আগেই বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী এবং তাঁর সহযোগীরা সরোয়ারকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছিলেন। সরোয়ারকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছিল, তাঁর সময় শেষ।

পরিবারের দাবি, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।

তবে সরোয়ারের ছোট ভাই আজিজ উদ্দিনের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিরোধের কারণেই তাঁর ভাইকে পরিকল্পিতভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার পর আবদুল কাদের বাদী হয়ে বায়েজিদ বোস্তামী থানায় মামলা করেন। এতে সাজ্জাদ আলীকে মূল হোতা হিসেবে উল্লেখ করে মোট সাতজনের নাম এবং আরও ১৫ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। গত এক বছরে এই মামলায় মোট ৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১০ জন কারাগারে আছেন, বাকিরা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। গত ২৯ আগস্ট যশোর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালানোর চেষ্টাকালে মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হয়।

নিহত সরোয়ার একসময় বড় সাজ্জাদের অনুসারী থাকলেও ২০১৬ সালের দিকে নিজেদের আলাদা বলয় গড়ে তোলেন, যা থেকেই এই বিরোধের সূত্রপাত।

এর আগে গত বছরের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এক্সেস রোডে সরোয়ারের গাড়িতে গুলির ঘটনা ঘটেছিল, যেখান থেকে তিনি অল্পের জন্য বেঁচে যান।

এখন পর্যন্ত পুলিশ ৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করলেও মামলার মূল অস্ত্রধারী এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইখতিয়ার উদ্দিন জানিয়েছেন, শুটারকে শনাক্ত করার কাজ অব্যাহত রয়েছে এবং তদন্ত চলছে। সুষ্ঠু তদন্ত করে পুলিশ বের করুক।’।

মামলার বাদী ও নিহত সরোয়ারের বাবা আবদুল কাদের নিজের চোখের সামনে ছেলের মৃত্যুর দৃশ্য এখনো ভুলতে পারছেন না। তিনি দ্রুত প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। বর্তমান সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহও এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, আধিপত্য বিস্তারই এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ, তবে নেপথ্যে রাজনৈতিক কোনো হাত রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। যদিও নেপথ্যে রাজনৈতিক বিরোধও থাকতে পারে বলে ধারণা পরিবারের। তিনি বলেন, ‘নিজের চোখের সামনে লোকজনের ভিড়ে যেভাবে ছেলেকে গুলি করে মেরেছে, তা কিছুতেই ভুলতে পারছি না।

সম্পাদক ও প্রকাশক | উইনিং গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান।

© 2026 মুখপত্র। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।