মুখপত্র
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৪ নভেম্বর, ২০২৬, ০১:১০ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৪ নভেম্বর, ২০২৬, ১১:০০ এএম

শেন ওয়ার্নকে যেভাবে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন সেলিম মালিক

খেলা
নিজস্ব প্রতিবেদক
শেন ওয়ার্নকে যেভাবে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন সেলিম মালিক

১৯৯৪ সালে পাকিস্তান সফরের প্রথম টেস্টটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল করাচিতে।

অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক মার্ক টেলরের ক্যারিয়ারের সেটি ছিল প্রথম টেস্ট ম্যাচ।

হাইওয়ে সদৃশ ব্যাটিং স্বর্গ পিচে চতুর্থ দিনের খেলা শেষে পাকিস্তানের সংগ্রহ ছিল ৩ উইকেটে ১৫৫ রান। জয়ী হতে স্বাগতিকদের তখন প্রয়োজন ছিল ৩১৪ রান। ওই সন্ধ্যায় অস্ট্রেলিয়ান লেগ স্পিনার শেন ওয়ার্ন তাঁর সতীর্থ টিম মের সঙ্গে রুমে থাকা অবস্থায় পাকিস্তান অধিনায়ক সেলিম মালিকের কাছ থেকে একটি ফোন পান। বারবার অনুরোধ করে ওয়ার্নকে নিজের রুমে ডাকেন সেলিম মালিক। ওয়ার্ন তখন তাঁকে ডাকতেন 'ইঁদুর' (Rat) নামে। সাদা কুর্তা পরিহিত মালিকের রুমে যাওয়ার পর তিনি ওয়ার্নকে জানান, পাকিস্তান দল কোনোভাবেই যেন এই ম্যাচ না হারে, কারণ এতে তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার ভয় ছিল। পাকিস্তানের অধিনায়ক স্বয়ং। ‘গুড ডে, মেইট, কেমন আছ?’ ‘খারাপ না, খারাপ না। শোনো, আমি কি একটু কথা বলতে পারি?’ ‘নিশ্চয়ই, কী হয়েছে?’ ‘না, তুমি কি দয়া করে আমার রুমে আসতে পারো?’ ‘উম, কেন। আমি মের সঙ্গে বসে আছি।’ ‘না, না, এটা খুব জরুরি। লেগ স্পিনের ‘রকস্টার’ ওয়ার্ন, আর তাঁর চোখে সেরা ১১। আমি ভাবলাম, ব্যাপারটা তো গুরুতর মনে হচ্ছে। মে জানতে চাইল, কে ফোন করেছিল। ‘ইঁদুর’, বললাম আমি। ওকে আমরা এই নামেই ডাকতাম, দেখতে ইঁদুরের মতো লাগত বলে, এই জন্য না যে সে একজন ‘ইঁদুর’ (খারাপ মানুষ); অন্তত সেই সময় পর্যন্ত নয়। সে কুর্তা পরা ছিল—পাকিস্তানের স্থানীয় লোকজন যে সাদা লম্বা জামা পরে, সেটা। ফোনে তোমাকে খুব চিন্তিত লাগছিল।’ ‘কাল আমরা হারতে পারব না।’ ‘আহ, ঠিক আছে, আমি নিশ্চিত তোমরা জেতার চেষ্টা করবে, আর আমরাও জেতার চেষ্টা করব। আশা করি, ভালো একটা ম্যাচ হবে।’ ‘না, না, তুমি বুঝছ না। লোকেরা আমাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেবে। জিততে হলে তাদের দরকার ৩১৪ রান। তবু বললাম, ‘মজা করছ নাকি?’ ‘আমি সিরিয়াস। তারপর সে বলল, ‘তুমি সিরিয়াস?’ ‘হ্যাঁ।’ ‘ধ্যাত।

কথপোকথনের এক পর্যায়ে সেলিম মালিক বোমা ফাটান। তিনি ওয়ার্ন ও টিম মেকে প্রতিটি বল অফ স্টাম্পের অনেক বাইরে করার বিনিময়ে দুই লাখ মার্কিন ডলার করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। মালিকের দাবি ছিল, এভাবে ম্যাচ ড্র করা সম্ভব। প্রথমে বিষয়টিকে রসিকতা মনে হলেও ওয়ার্ন মালিকের গম্ভীর চাহনি দেখে বুঝতে পারেন যে তিনি সিরিয়াস। ওয়ার্ন সরাসরি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জানান, তারা ম্যাচটি জয়ের লক্ষ্যেই খেলছেন। এরপর ওয়ার্ন দ্রুত নিজের রুমে ফিরে সতীর্থ টিম মেকে বিষয়টি জানান। চমকে ওঠা টিম মে এবং ওয়ার্ন তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি তৎকালীন অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক মার্ক টেলর ও কোচ বব সিম্পসনকে অবহিত করার সিদ্ধান্ত নেন।

টেলর ও সিম্পসন বিষয়টি শুনে হতবাক হয়ে পড়েন। অধিনায়ক হিসেবে টেলরের জন্য এটি ছিল প্রথম পরীক্ষা, যেখানে তিনি ব্যাট হাতে জোড়া শূন্য করেছিলেন। এমন চাপের মধ্যে নিজের দলের প্রধান বোলারদের কাছে ফিক্সিংয়ের কথা শোনাটা ছিল কঠিন অভিজ্ঞতা। বব সিম্পসন পুরো ঘটনাটি একটি রিপোর্টে লিখে ম্যাচ রেফারি নিউজিল্যান্ডের জন রিডের কাছে জমা দেন। অস্ট্রেলিয়ানরা ধরে নিয়েছিলেন, রিড বিষয়টি আইসিসিকে জানিয়েছেন, তবে পরবর্তী সময়ে তারা আর কোনো আপডেট পাননি।

ম্যাচটির শেষ দিন ছিল অবিশ্বাস্য উত্তেজনায় ঠাসা। ওয়ার্ন চতুর্থ দিন বিকেলে ১টি এবং পঞ্চম দিনে আরও ৪টি উইকেট শিকার করেন। এক পর্যায়ে পাকিস্তানের জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ১৫৯ রানের বিপরীতে তাদের হাতে ছিল ৭ উইকেট। ইনজামাম-উল-হক এবং মুশতাক আহমেদের জুটি জয়ের পথ তৈরি করছিল। পাকিস্তানের নবম উইকেট পতনের সময়ও দলটির জয়ের জন্য ৫৬ রান প্রয়োজন ছিল। শেষের দিকে আম্পায়ার ইনজামামের এলবিডব্লিউর একটি পরিষ্কার সুযোগ না দেওয়ায় অস্ট্রেলিয়া বেশ বিপাকে পড়ে। সবশেষে ৩ রান দরকার থাকা অবস্থায় ওয়ার্নের বলে ইনজামাম রান নেওয়ার সময় হিলস উইকেট মিস করলে চার বাই থেকে পাকিস্তান জয় ছিনিয়ে নেয়। তাই তোমাদের কাজটা বেশ কঠিন এবং সম্ভবত আমরাই জিতব। ফিক্সিং, বিদ্রোহ এবং ষড়যন্ত্রে ভরা ড্রেসিংরুম: পাকিস্তান ক্রিকেটের অস্থির অধ্যায়। পাকিস্তানের নবম উইকেটটা যখন পড়ল, তখনো ৫৬ রান দরকার ছিল। আধা ঘণ্টার মধ্যে তোমাদের রুমে টাকা পৌঁছে দেওয়া হবে।’ ‘কী।

পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ম্যান অব দ্য ম্যাচ ওয়ার্নকে সামনে পেয়ে সেলিম মালিক বিদ্রূপ করে বলেছিলেন, 'টাকাটা নিলে ভালো করতে, কী বলো?' সেই সময় ওয়ার্ন নিজেকে সামলে নিলেও ঘটনাটি কখনোই ভুলতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে সেলিম মালিক আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ হন। ১৯৯৪ সালের এই করাচি টেস্ট থেকেই বিশ্ব ক্রিকেটে 'ম্যাচ ফিক্সিং' শব্দটি ব্যাপকভাবে পরিচিতি পায়। পাকিস্তানি আদালতে সেলিম মালিকের বিচারের সময় তিনি ওয়ার্নকে মিথ্যাবাদী হিসেবে অভিহিত করেছিলেন এবং এমন কোনো বৈঠকের কথা অস্বীকার করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে জানা যায় যে, মার্ক ওয়াহকেও প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। সত্য উদ্ঘাটনে মার্ক ওয়াহও পাকিস্তানে গিয়ে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। যে পাকিস্তানি আদালত সেলিমকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল, সেখানে সে আমাকে মিথ্যাবাদী বলেছিল। ভেবে দেখো এবং কাল সকালের আগে আমাকে জানিও।’ ‘ভাবার কিছু নেই।

সম্পাদক ও প্রকাশক | উইনিং গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান।

© 2026 মুখপত্র। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।