মুখপত্র
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০২:২৯ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০৭:০০ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস হাতছাড়া, বড় ধাক্কা খেলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস হাতছাড়া, বড় ধাক্কা খেলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জনমত জরিপের পূর্বাভাসই শেষ পর্যন্ত সত্য প্রমাণিত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ—উভয়ই হাতছাড়া করেছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির এই বিজয় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছরকে রাজনৈতিকভাবে বেশ কঠিন করে তুলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিভেদ সৃষ্টির রাজনীতি ও নানা অপকৌশলের বিপরীতে মার্কিন ভোটাররা ডেমোক্র্যাটদের পক্ষেই রায় দিয়েছেন। তদন্তের আওতায় পড়তে পারে ট্রাম্পের পরিবার ও মিত্ররাও। তবে এর পরের নির্বাচনে জিতে দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন ২০২৫ সালে। মোটকথা, আইন পাস কিংবা কংগ্রেসের অনুমোদনে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য। সেই মেয়াদ শেষে নির্বাচনে হেরে যান তিনি। ট্রাম্পের কথামতো এই যুদ্ধ দ্রুত তো শেষই হয়নি, বরং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে। বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক চাপিয়ে ট্রাম্প যে ফায়দা লোটার কথা বলেছিলেন, তা-ও বাস্তবে হয়নি। নির্বাচন ঘিরে ট্রাম্পের নিজের সিদ্ধান্তেও কিছু গলদ আছে। নির্বাচনে সরাসরি ভোট গ্রহণ হয় গত মঙ্গলবার।

প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রেসিডেন্টের প্রথম দুই বছরের কর্মকাণ্ডের ওপর গণভোট হিসেবে দেখা হয়। ইরান যুদ্ধ, নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, বিতর্কিত শুল্কনীতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগগুলো ভোটারদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছিল। জরিপকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আগে থেকেই এমন ফলাফলের ইঙ্গিত দিয়েছিল, তবে ভোটের চূড়ান্ত সংখ্যা সেই পূর্বাভাসকেও ছাড়িয়ে গেছে। ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় বসেন ২০১৭ সালে।

প্রতিনিধি পরিষদের মোট ৪৩৫টি আসনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ২১৮টি আসনের প্রয়োজন হয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকানরা ২১৮টি এবং ডেমোক্র্যাটরা ২১৪টি আসন পেয়েছিল। কিন্তু এবার চিত্র পুরোপুরি পাল্টে গেছে। স্থানীয় সময় গত বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যে ২২৫টি আসন নিশ্চিত করেছে, যেখানে রিপাবলিকানরা পেয়েছে ১৩৮টি। প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের এই বিজয় গত ৩৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড়, যা ১৯৯০ সালের ২৬৭ আসনের পর এক মাইলফলক। প্রতিনিধি পরিষদের মোট ৪৩৫ আসনে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি পেয়েছিল ২১৮ আসন। এবার মধ্যবর্তী নির্বাচনে গতকাল বুধবার নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত (বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১১টা) প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা পেয়েছেন ২২৫ আসন। ৭৩ আসনের ফলাফল ঘোষণা বাকি থাকতেই এই ‘ম্যাজিক ফিগার’ পেরিয়ে গেছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। নির্বাচনের আগে সিনেটের চিত্র ছিল রিপাবলিকান পার্টি ৫৩ আসন, ডেমোক্রেটিক পার্টি ৪৫ আসন। রিপাবলিকানরা পেয়েছেন ১৩৮ আসন। এবারের নির্বাচনে ধনী বা দরিদ্র, শিক্ষার হার বেশি বা কম-নির্বিশেষে অনেক এলাকাতেই সমর্থন হারিয়েছেন রিপাবলিকানরা।

সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে এবার ৩৫টিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আগের হিসাব অনুযায়ী সিনেটে রিপাবলিকানদের ৫৩ ও ডেমোক্র্যাটদের ৪৫টি আসন ছিল (সাথে দুইজন স্বতন্ত্র সদস্য ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন দিতেন)। সর্বশেষ ফলাফল অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটদের দখলে এখন ৫৪টি আসন এবং রিপাবলিকানদের দখলে ৪৪টি। এর ফলে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাম্প এখন আইন প্রণয়ন ও গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সাংবিধানিক বাধার মুখে পড়বেন। জনপ্রিয়তায় এই ধসের পেছনের কারণগুলোই মূলত নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পথ তৈরি করে দিয়েছে। যেমন রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি টেক্সাসের সিনেটর প্রার্থী কেন প্যাক্সটন ও সাউথ ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর প্রার্থী ডারলিন গ্রাহাম।

নির্বাচনের পর থেকেই ডেমোক্র্যাট শিবিরে জয়ের উল্লাস দেখা যাচ্ছে।

প্রতিনিধি পরিষদে দলটির নেতা হাকিম জেফ্রিস বলেছেন, মার্কিন নাগরিকরা কট্টরপন্থা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট রায় দিয়েছেন। তিনি নতুন স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের অপেক্ষায় আছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কর্মীদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, পরিবর্তন নিশ্চিত করতে এখন ডেমোক্র্যাটদের কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। অন্যদিকে, সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প সুর নরম করে ডেমোক্র্যাটদের অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং দেশের কল্যাণে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের গবেষক লরেল র‍্যাপের মতে, আগামী দুই বছর ট্রাম্প নীতি নির্ধারণে অনেক বাধার সম্মুখীন হবেন, তবে সামরিক অভিযান বা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁর হাতে এখনো নির্বাহী ক্ষমতা রয়ে গেছে। রয়টার্স/ইপসসের জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তাঁর দুই মেয়াদের মধ্যে সবচেয়ে নিচে নেমে ৩১ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল।

নির্বাচনী ফলে ইতিহাস গড়ার মতো অনেক ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন আব্দুল আল-সাইদ। এছাড়া আদিবাসী নারী গভর্নর হিসেবে নিউ মেক্সিকো থেকে ডেব হালান্ড, প্রথম আদিবাসী নারী সিনেটর হিসেবে মিনেসোটা থেকে পেগি ফ্ল্যানাগান, প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হিসেবে জর্জিয়া থেকে কেইশা ল্যান্স এবং প্রথম লাতিন গভর্নর হিসেবে টেক্সাস থেকে জিনা হিনোজোসা জয়লাভ করেছেন। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আগামী জানুয়ারিতে শপথ নেবেন।

গভর্নর নির্বাচনেও ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে আছেন। মোট ৩৬টি আসনের মধ্যে ৫০ অঙ্গরাজ্যের ২৮টি এখন তাদের দখলে, যেখানে রিপাবলিকানরা পেয়েছে ২০টি। নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও পাওয়া গেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা একে 'নতুন যুগের সূচনা' হিসেবে অভিহিত করেছেন। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেনবাউম লাতিন প্রার্থীদের জয়কে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সাফ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ এই নির্বাচন ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্কের তিক্ততায় কোনো প্রভাব ফেলবে না।

ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষের মাত্রা ছিল ভয়াবহ। এসএসআরএস-এর বুথফেরত জরিপ বলছে, তিন-চতুর্থাংশ ভোটার দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তুষ্ট। প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার কংগ্রেসের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত দিয়েছেন। ডেমোক্র্যাটরা তাদের প্রচারণায় মূলত দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও ট্রাম্প পরিবারের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। বেশির ভাগ জরিপে বলা হচ্ছিল, কংগ্রেসের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছেন ডেমোক্র্যাটরা। সঙ্গে আছে ট্রাম্প পরিবারের সদস্যের বিরুদ্ধে সরকারি নীতিকে কাজে লাগিয়ে সম্পদ বাড়ানোর অভিযোগ। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ এমন সব সরকারি নীতির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন, যেগুলো মানুষকে আরও দরিদ্র করে তোলে। ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনী প্রচারে এগুলো ভালোমতোই কাজে লাগিয়েছেন।

সম্পাদক ও প্রকাশক | উইনিং গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান।

© 2026 মুখপত্র। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।