স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই বাংলাদেশে নিত্যপণ্যের বাজারদর নিয়ে প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল সরকারি দৈনিক বাংলা। ১৯৭১ সালের ২৭ ডিসেম্বর সেই প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘ঢাকায় মাছ, ডিম ও শাকসবজির দাম কমেছে’। তবে এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মাত্র ২২ দিন পর, ১৯৭২ সালের ১৯ জানুয়ারি একই পত্রিকা জানায়, ‘দ্রব্যমূল্য বাড়ছে, অতি মুনাফার লালসাই প্রধান কারণ’। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতিকে পুঁজি করে সেই শুরু হওয়া দাম বৃদ্ধির প্রবণতা গত ৫৫ বছরে কেবল দীর্ঘই হয়েছে। বাজেট আলোচনায় বারবার উঠে এসেছে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কথা, যেখানে সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার পাল্লাই বেশি ভারী। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা সরবরাহের অজুহাত দেখিয়ে থাকেন।
বিশ্বজুড়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি কেবল একটি অর্থনৈতিক সূচক নয়, বরং জনজীবনে চরম দুর্দশার নামান্তর। হাইপার-ইনফ্লেশন বা অতিমূল্যস্ফীতির ইতিহাসে দেখা গেছে, হাঙ্গেরিতে ১৯৪৬ সালে প্রতি ১৫ ঘণ্টায় জিনিসের দাম দ্বিগুণ হতো। এছাড়া ১৯২৩ সালের অক্টোবরে জার্মানিতে মাসিক মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ২৯ হাজার ৫০০ শতাংশ, ২০০৮ সালের নভেম্বরে জিম্বাবুয়ের চিত্র ছিল ৭ হাজার ৯৬০ কোটি শতাংশ, ১৯৯৪ সালের জানুয়ারিতে যুগোস্লাভিয়ায় তা ছিল প্রায় ৩১ কোটি ৩০ লাখ শতাংশ, ভেনেজুয়েলায় ২০১৮ সালে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ১ লাখ ৩০ হাজার শতাংশ এবং আর্জেন্টিনায় ১৯৮৯ সালের জুলাইয়ে মাসে ১৯৬ দশমিক ৬ শতাংশ দাম বেড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রেও ১৯৬৫ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় উচ্চ মূল্যস্ফীতির মুখে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড একে ‘এক নম্বর গণশত্রু’ আখ্যা দিয়েছিলেন। কোন কোন জিনিসের দাম ইতিমধ্যেই আকাশচুম্বী হয়ে জনগণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবার উপক্রম হয়েছে। চাল, ডাল, সরিষার তেল, সাবান, শিশুখাদ্য, সিগারেট, দেশলাই, ব্লেড, ইত্যাদি হরেক রকমের জিনিসের মূল্যই বেড়েছে। অতিমূল্যস্ফীতির উদাহরণও অনেক আছে, যাকে তত্ত্বগতভাবে বলা হয় হাইপার–ইনফ্লেশন। সাধারণভাবে, এক মাসে মূল্যস্ফীতি ৫০ শতাংশ ছাড়ালে তাকে হাইপার–ইনফ্লেশন বলা হয়। ১৯৭৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড মূল্যস্ফীতিকে ‘পাবলিক এনিমি নম্বর ওয়ান’ বা ‘এক নম্বর গণশত্রু’ বলেছিলেন। বিশ্বে সবচেয়ে ভয়াবহ হাইপার–ইনফ্লেশনের ঘটেছিল হাঙ্গেরিতে। আর এই চাপ কেবল জনজীবনে দুর্ভোগ আনে, তা নয়, রাষ্ট্রও বিপদে পড়ে।
খাদ্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কেবল নিত্যজীবনকে কঠিন করে না, বরং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাকেও হুমকির মুখে ফেলে। ১৯৭০ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ১২০টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি নিম্ন আয়ের দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ায়। ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের গণঅভ্যুত্থানের পেছনেও অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি, তরুণদের কর্মসংস্থান সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব ছিল। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের ২০২৫ সালের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টেও এসব কারণ উঠে এসেছে, যেখানে ২০২২ সাল থেকে শুরু হওয়া পরিস্থিতির উল্লেখ রয়েছে। শুরুটা ছিল এ রকম: ‘রাজধানী ঢাকা শহরসহ বাংলাদেশের সর্বত্র স্বাভাবিক জীবনযাত্রা শুরু এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃ-প্রতিষ্ঠার পর হতে শহরে বিভিন্ন দ্রব্যাদির আমদানী দিন দিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের জন্যে এটা নেহায়েতই স্বাভাবিক। ২০১১ সালে এক গবেষণায় এমনটাই দেখা গেছে। ‘ফুড প্রাইসেস অ্যান্ড পলিটিক্যাল ইনস্ট্যাবিলিটি’ নামের সেই গবেষণায় ১৯৭০ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ১২০টির বেশি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। কেননা, খাবারের দাম বাড়লে দরিদ্র মানুষের জীবন কঠিন হয়, এই চাপ অন্য ক্ষোভের সঙ্গে মিলে অস্থিরতা বাড়ায়। কেবল নিম্ন আয় ও উন্নয়নশীল দেশেই এমনটা ঘটছে, তা–ও নয়।
বর্তমানে বাংলাদেশ ১৯৯০ সালের পরবর্তী দীর্ঘতম অর্থনৈতিক মন্দা বা স্ট্যাগফ্লেশনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভোক্তা মূল্যসূচক বেড়েছে ৫৪ শতাংশ, যেখানে মজুরি সূচক বেড়েছে মাত্র ৪৫ শতাংশ। শুধু যে নিত্য দিনের অতি আবশ্যকীয় কেরোসিনের দামই বেড়েছে তা নয়।
এর ফলে সাধারণ মানুষ চরম চাপের মুখে পড়েছে।
পিপিআরসির ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১৮ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে থাকলেও যেকোনো অর্থনৈতিক ধাক্কায় দারিদ্র্যে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। এছাড়া বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২২ সালে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে ছিলেন, যাদের এখন দারিদ্র্যের হারে পড়ার আশঙ্কা প্রবল। মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২১ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একটি পরিবারের ওপর এই ব্যয়ের প্রভাব নিরূপণ করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। ধরা যাক, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে যে পণ্য কিনতে ২০ হাজার টাকা লাগত, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে তা কিনতে ব্যয় করতে হচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার ৮০০ টাকা। অথচ একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধি বিবেচনায় ওই পরিবারের আয় সর্বোচ্চ ২৯ হাজার টাকা হওয়ার কথা। ফলে মাসে প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা সাধারণ পরিবারের সঞ্চয়হীনতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সরকারি জরিপ ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে ২০২৫’ অনুযায়ী, গত এক বছরে প্রায় ৪৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পরিবার তাদের দৈনন্দিন খরচ মেটাতে ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু, সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি থাকলেই যে সাড়ে ছ টাকার কেরোসিন তেল চব্বিশ টাকা বিক্রি করতে হবে তার পেছনে অতি মুনাফার লোভ ছাড়া অন্য কোন ন্যায়সঙ্গত যুক্তি নেই। এ ছাড়া এর পেছনে যে মজুতদার ব্যবসায়ী লালসা কাজ করছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু আয় পাল্লা দিতে পারেনি ব্যয়ের সঙ্গে।
এই মূল্যস্ফীতির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে ২০২৬ সালে দুটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। জোনাস ভিলিবাল্ড স্মিট ও জ্যাকব নিরুপের গবেষণায় দেখা গেছে, গণতান্ত্রিক দেশে অর্থনীতি ভালো চললে অর্থমন্ত্রীদের পদে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। অন্যদিকে জোনাথন ফেডারলে, ক্যাথরিন মোহর ও মরিৎস শুলারিকের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রত্যাশার চেয়ে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ বেশি হলে সরকারবিরোধী ও জনতুষ্টিবাদী দলগুলোর ভোট গড়ে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট কি দ্রুত কাটবে? আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাসে আশার আলো খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। অর্থমন্ত্রী পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও দুই বছর সময়ের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বিপুল জনসমর্থন পাওয়া সরকারের কাছে সাধারণ ভোটাররা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিনিয়োগ মন্দা কাটিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন দক্ষতা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও সুশাসনের কোনো বিকল্প নেই। এই সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্র কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষ সব সময় অনুভব করে এসেছেন, কেন মূল্যস্ফীতিকে অর্থনীতিবিদেরা নীরব ঘাতক বলে থাকেন।