মুখপত্র
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ১১:১৮ এএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ১১:৩৬ এএম

কর্মের প্রতিফলন ও জাতির পরিণতি: সূরা বনী ইসরাঈলের চিরন্তন শিক্ষা

ধর্ম ও জীবন
Sub Editor
কর্মের প্রতিফলন ও জাতির পরিণতি: সূরা বনী ইসরাঈলের চিরন্তন শিক্ষা

কোরআনুল কারিমের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৭

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে  

اِنۡ اَحۡسَنۡتُمۡ اَحۡسَنۡتُمۡ لِاَنۡفُسِكُمۡ ۟ وَ اِنۡ اَسَاۡتُمۡ فَلَهَا ؕ فَاِذَا جَآءَ وَعۡدُ الۡاٰخِرَۃِ لِیَسُوۡٓءٗا وُجُوۡهَكُمۡ وَ لِیَدۡخُلُوا الۡمَسۡجِدَ كَمَا دَخَلُوۡهُ اَوَّلَ مَرَّۃٍ وَّ لِیُتَبِّرُوۡا مَا عَلَوۡا تَتۡبِیۡرًا ﴿۷﴾

সরল অনুবাদ

৭. তোমরা সৎকাজ করলে সৎকাজ নিজেদের জন্য করবে এবং মন্দকাজ করলে তাও করবে নিজেদের জন্য। তারপর পরবর্তী নির্ধারিত সময় উপস্থিত হলে (আমি আমার বান্দাদের পাঠালাম) তোমাদের মুখমন্ডল কালিমাচ্ছন্ন করার জন্য, প্রথমবার তারা যেভাবে মসজিদে প্রবেশ করেছিল আবার সেভাবেই তাতে প্রবেশ করার জন্য এবং তারা যা অধিকার করেছিল তা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার জন্য।

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

সুরা বনী ইসরাঈলের এই আয়াতের সূচনা হয়েছে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সত্য দিয়ে। সেটি হচ্ছে- মানুষের প্রতিটি কাজের ফল শেষ পর্যন্ত তাকেই বহন করতে হয়।
আল্লাহ তাআলা এখানে বনী ইসরাঈলকে সম্বোধন করলেও এই নীতির ব্যাপকতা সার্বজনীন। তাফসিরে ইবনে কাসীর উল্লেখ করেন, এটি আল্লাহর সুন্নাহ—কোনো জাতি ন্যায় ও সৎকর্মে অটল থাকলে তার সুফল ভোগ করে, আর যখন সীমালঙ্ঘন ও অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়, তখন তার পরিণামও অনিবার্যভাবে ভোগ করতে হয়।

আয়াতের প্রথম অংশে বলা হয়েছে— “তোমরা সৎকাজ করলে নিজেদের জন্যই করবে, আর মন্দকাজ করলেও নিজেদের জন্যই করবে।” ইমাম তাবারী (রহ.) বলেন, এর মাধ্যমে আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, মানুষের কাজের কোনো ফল আল্লাহর দিকে ফিরে যায় না; বরং তা সরাসরি মানুষের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনে প্রতিফলিত হয়।
বনী ইসরাঈল যখন নবীদের হত্যা করেছে, কিতাব বিকৃত করেছে এবং জুলুমে লিপ্ত হয়েছে; তার ফল তারা নিজেদের ইতিহাসেই প্রত্যক্ষ করেছে।

এই অংশ মানবসভ্যতার জন্য এক গভীর নৈতিক শিক্ষা বহন করে: সেটি হচ্ছে এই যে, ধর্মীয় পরিচয় বা ঐতিহাসিক মর্যাদা কাউকে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করে না, যদি কর্ম ও আচরণে অবাধ্যতা প্রবল হয়।

আয়াতের দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে— “অতঃপর পরবর্তী প্রতিশ্রুত সময় উপস্থিত হলে…” তাফসিরে কুরতুবী ও ইবনে কাসীরের বর্ণনা অনুযায়ী, এটি বনী ইসরাঈলের দ্বিতীয় বড় বিপর্যয়ের দিকে ইঙ্গিত করে। তারা প্রথমবার ফাসাদ সৃষ্টি করলে আল্লাহ তাদের ওপর শত্রু পাঠিয়েছিলেন।
পরে তারা আবারও সীমালঙ্ঘনে লিপ্ত হলে আল্লাহ দ্বিতীয়বার তাঁর শাস্তি কার্যকর করেন।

ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন, এখানে “আমার বান্দাদের পাঠালাম” বলতে এমন এক শক্তিশালী বাহিনী বোঝানো হয়েছে, যাদের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন। অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এটি রোমান সম্রাট টাইটাসের বাহিনীর দিকে ইঙ্গিত করে, যারা খ্রিষ্টপূর্ব ৭০ সালে বাইতুল মুকাদ্দাস ধ্বংস করে।

“তোমাদের মুখমণ্ডল কালিমাচ্ছন্ন করার জন্য”—এই বাক্যাংশ তাফসিরে বিশেষভাবে ব্যাখ্যাত। ইমাম রাযী (রহ.) বলেন, এটি কেবল বাহ্যিক লাঞ্ছনার কথা নয়; বরং চূড়ান্ত অপমান, মানসিক ভাঙন ও আত্মসম্মান ধ্বংসের প্রতীক।
একটি জাতি যখন আল্লাহর বিধান ত্যাগ করে এবং জুলুমকে স্বাভাবিক করে তোলে, তখন তাদের পরাজয় শুধু সামরিক নয়; নৈতিক ও আত্মিকও হয়ে ওঠে।

আয়াতে বলা হয়েছে— “প্রথমবার তারা যেভাবে মসজিদে প্রবেশ করেছিল আবার সেভাবেই তাতে প্রবেশ করার জন্য এবং যা অধিকার করেছিল তা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার জন্য।” এখানে “মসজিদ” বলতে বাইতুল মুকাদ্দাস বোঝানো হয়েছে। তাফসিরে ইবনে কাসীর উল্লেখ করেন, শত্রু বাহিনী এমনভাবে সেখানে প্রবেশ করে যে, কোনো পবিত্রতা, মর্যাদা বা ঐতিহাসিক সম্মান অক্ষুণ্ণ থাকে না। শহর, উপাসনালয় ও ক্ষমতার প্রতীক; সবই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ভয়াবহ বার্তা: যে জাতি আল্লাহর ঘর ও বিধানের মর্যাদা নিজেই নষ্ট করে, আল্লাহ অন্যদের মাধ্যমে সেই ধ্বংস পূর্ণতা দেন।

এই আয়াত কেবল বনী ইসরাঈলের ইতিহাস নয়; বরং এটি উত্থান ও পতনের একটি চিরন্তন সূত্র। ক্ষমতা, সভ্যতা ও ধর্মীয় পরিচয়; কোনোটিই স্থায়ী নয় যদি ন্যায়, আমানতদারিতা ও আল্লাহভীতি না থাকে। ইবনে কাসীরের ভাষায়— “এই আয়াত প্রত্যেক উম্মতের জন্য সতর্কবার্তা; যেন তারা পূর্ববর্তী জাতির পরিণতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।”

অতএব, কোরআনের এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়— নিজেদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ রচনা করে; আল্লাহ অন্যায়কে সময় দেন, কিন্তু ছাড় দেন না।

সম্পাদক ও প্রকাশক | উইনিং গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান।

© 2026 মুখপত্র। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।