প্রিন্ট এর তারিখঃ ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:১৪ পিএম || প্রকাশের তারিখঃ ১৬ অক্টোবর, ২০২৩, ০৪:১০ এএম
মদ্যপানে দুই তরুণীর মৃত্যুর রহস্য নিয়ে যে তথ্য দিলেন পুলিশ
মাদারীপুরে দুই তরুণীর মৃত্যু অতিরিক্ত মদ পানে হয়েছে বলে দাবি করেছেন জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম। তিনি বলেন, ঢাকা থেকে আনা দেশী বাংলা মদ ও বিদেশী মদ একসঙ্গে মিলিয়ে তারা পান করেন। তারপর তাঁরা উচ্চ শব্দে গান বাজিয়ে নাচ করেন।
এর আগে শনিবার রাত আড়াইটার দিকে প্রথমে সাগরিকা আহমেদ (২৫) ও দুই ঘন্টা ব্যাবধানে তার বান্ধবী পারুল আক্তার (২৭) হাসপাতালে নেওয়ার পরে মারা যান। পরে তাদের লাশ দুটি পুলিশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করেন।
এদিকে ওই দুই তরুণী ছাড়াও নিহত সাগরিকার মা সাবিনা ইয়াসমিন (৪০) তার মামা বাবু (৩৬) ও আরেক নারী ডালিয়া বেগম (৪৫) মদ পান করে অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। পরে তাদের তিন জনকেই গুরতর অবস্থায় উদ্ধার করে মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
মারা যাওয়া সাগরিকা শহরের উকিলপাড়া এলাকার কে এইচ শাকিল আহমেদের মেয়ে ও পারুল ডাসার উপজেলার বালিগ্রাম ইউনিয়নের বাঘোয়র এলাকার ইয়াদ আলী মাতুব্বরের মেয়ে। নিহত দুজন একে অপরের বান্ধবী।
রোববার বিকেলে জেলার পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, ‘ওই ফ্লাটে একসঙ্গে ৫ থেকে ৬ জন মদ পান করেন। মদ পানের সেই ভিডিও আমাদের কাছে আছে। ওই ফ্লাট থেকে মদের বোতল পাওয়া গেছে। তাই আমরা প্রাথমিক ভাবে তাদের মৃত্যুটি মদ্যপানেই হয়েছে বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। এ ছাড়াও লাশ দুটির সুরতহাল করে দুই তরুণীর শরীরে কোন প্রকার আঘাত বা অন্য কোন চিহ্নি পাওয়া যায়নি।’
অবৈধ এই মদ এই বাড়িতে এল কিভাবে? এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, ‘কেরু এন্ড কোং এর একটি বোতল পাওয়া গেছে। সাগরিকার মায়ের ভাষ্য, তার মেয়ের এক বান্ধবি ঢাকা থেকে একটি বোতলে করে মদ নিয়ে আসে। সেই মদের সঙ্গে দেশি বাংলা মদ মিশিয়ে তারা (নিহত দুই তরুণী) পান করেন। মন নিয়ে আসা সেই বান্ধবি কে তার নাম পরিচয় আমরা এখনো জানতে পারিনি। তার নাম পরিচয় জানার চেষ্টা করছি। তবে সাগরিকার মা, মামা ও আরও একজন নারীকে আমরা আটক করেছি। তাদেরকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পহেলা অক্টোবর মাদারীপুর শহরের কলেজ রোড এলাকার লুৎফর রহমান মোল্লা বাসার চতুর্থ তলার একটি ফ্লাট ভাড়া নেয় সাগরিকা আহম্মেদ নামে এক নারী। সাগরিকার সঙ্গে তার মা সাবিনা ইয়াসমিন ও মামা বাবু থাকতেন। শনিবার রাতে সাগরিকার বান্ধবী পারুল, সাথী সাথে ডালিয়া নামে আরও এক নারী তাদের বাসায় প্রবেশ করে। পরে মদ পান করে নাচ-গান করে কক্ষেই থাকে সবাই। রাত আড়াইটার দিকে ঘরের ভেতরেই অসুস্থ্য হয়ে মারা যান সাগরিকা। এ সময় গুরুতর অসুস্থ হয় আরও চার জন। বিষয়টি টের পেয়ে ওই বাসার কেয়ারটেকার হেলাল সরদার ও আর দুই প্রতিবেশির সহযোগিতায় ওই কক্ষে গিয়ে সাগরিকার ও তার মা, মামা ও বন্ধবি পারুলকে অসুস্থ্য অবস্থা উদ্ধার করে মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালের নিয়ে যায়। পরে রোববার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় পারুল। ঘটনার পর সকালে ওই বাসায় সদর মডেল থানা, সিআইডি, গোয়েন্দা ও বিশেষ শাখা পুলিশের একাধিক দল পরিদর্শনে গিয়ে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেন।
মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালের চিকিৎসা কর্মকর্তা রিয়াদ মাহামুদ বলেন, ‘অতিরিক্ত নেশা করায় রোগীদের অবস্থা তেমন একটা ভাল না। আমরা আমাদের সাধ্যমত আহত তিনজনকে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। তাদের আলামত সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট পাওয়ার পরে পরবর্তী চিকিৎসা দেওয়া হবে।’
এদিকে এ ঘটনায় মোবাইলে ধারণ করা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, কক্ষের ভিতরে টেলিভিশনে হিন্দি গান বাজিয়ে নাচ করছেন সাগরিকা নামে এক তরুণী। শুয়ে আছে আরো কজন নারী। আর চেয়ারে বসে আছেন সাগরিকার মামা বাবু। নাচ-গানের সাথে তাদের সবাইকে উল্লাস করতেও দেখা যায়।
ওই বাসার কেয়ারটেকার হেলাল সরদার বলেন, ‘রাতে চিৎকার চেচামেচি শুনে এগিয়ে যাই। পরে দেখে একজন মরে ফ্লোরে শুয়ে আছে, কয়েকজনের অবস্থায় ভাল না, মাতলামি করছে। পরে হাসপাতালে নিয়ে আসার পর আরও একজন মারা যায়। পরে পুলিশকে খবর দেই। এই বাড়িতে কিভাবে কী হলো কিছুই বুঝতে পারলাম না।’
সাগরিকাদের প্রতিবেশি সুমি আক্তার বলেন, ‘হেলালের চিৎকার শুনে সাগরিকাদের ঘরে যাই। সেখানে দেখি সবাই চিতকাত হয়ে পড়ে আছে। কেউ বিছানায় কেউ ফ্লোরে। ঘরটাও ছিল অগোছানো।’
নিহত সাগরিকার মা সাবিনা ইয়াসমিন অসুস্থ্য অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি। তার কাছে রাতের ঘটনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ের বান্ধবি পারুল মদ আনে। ওই মদ সবাই কমবেশি খাই। অন্যরা নাচ গান করেছে। আমি বসে ছিলাম। হঠাৎ সাগরিকা অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। এরপর কি থেকে কি হয়ে গেল কিছুই বুঝলাম না।’