লন্ডনের রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে সংগীত চ্যাম্পিয়ন ব্রিটিশ বাংলাদেশি কিশোর
মুখপত্র অনলাইন ডেস্ক
লন্ডনের বিশ্বখ্যাত রয়্যাল অ্যালবার্ট হলের বিশাল মঞ্চে প্রায় পাঁচ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে সংগীতের জাদুতে মুগ্ধ করল ১৬ বছর বয়সী ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কিশোর নাভহান উজায়ের রঈস চৌধুরী। যুদ্ধের বিপরীত দুই প্রেমিক-প্রেমিকার গল্পকে সংগীতের মাধ্যমে তুলে ধরে নাভহান। ভাষা বা সংগীতের ধরন–নির্বিশেষে সব ধরনের সংগীত তার কাছে উপভোগ্য।
বুধবার অনুষ্ঠিত ‘ফিউচার মেকার্স ২০২৬’ সংগীত প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে নিজের রচিত পিয়ানো কম্পোজিশন পরিবেশন করে বিচারকদের রায়ে চ্যাম্পিয়ন নির্বাচিত হয় সে। যুক্তরাজ্যের ১৪ থেকে ১৯ বছর বয়সী উদীয়মান সংগীতশিল্পীদের নিয়ে ২০২২ সালে এই প্রতিযোগিতার যাত্রা শুরু হয়েছিল। যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে আসা প্রতিভাবান কিশোর-তরুণ সংগীতশিল্পীদের পরিবেশনা চলছে। শেষ পর্যন্ত তার হাতেই ওঠে রয়্যাল অ্যালবার্ট হলের ‘ফিউচার মেকার্স ২০২৬’ সংগীত প্রতিযোগিতার চ্যাম্পিয়নের সম্মাননা। প্রতিযোগীদের বয়স ১৪ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকেরাও উপস্থিত ছিলেন।
নাভহান এই প্রতিযোগিতায় তার নিজের লেখা পিয়ানো সুর ‘লা দ্যুল্যর এক্সকিজ’ (La douleur exquise) পরিবেশন করে। ফরাসি এই শব্দগুচ্ছের অর্থ ‘তীব্র বেদনা’। যুদ্ধ ও ভালোবাসার প্রেক্ষাপটে এফ-শার্প মাইনর স্কেলে রচিত এই সুরের মাধ্যমে সে ঘৃণার বিপরীতে ভালোবাসার জয়গান গেয়েছে। পিয়ানোর দুটি হাতের বিপরীতধর্মী সুরের মূর্ছনায় সে সংঘাত ও আবেগের মেলবন্ধন ফুটিয়ে তোলে। এবারের প্রতিযোগিতায় হাজারো আবেদন জমা পড়ে। পিয়ানোয় ডান ও বাঁ হাতের বিপরীতধর্মী সুরে তিনি ফুটিয়ে তোলেন দুই পক্ষের সংঘাত, ভালোবাসা, বেদনা ও আবেগ।
হাজারো আবেদনকারীর মধ্য থেকে প্রাথমিক বাছাই এবং জুন মাসে অনুষ্ঠিত সরাসরি অডিশনের ধাপ পেরিয়ে সে চূড়ান্ত পর্বের ৯ প্রতিযোগীর তালিকায় জায়গা করে নেয়। এই অর্জনের ফলে নাভহান আগামী এক বছর রয়্যাল অ্যালবার্ট হল থেকে পেশাদার সংগীতজীবন গড়ার জন্য বিশেষ সহায়তা পাবে। এর মধ্যে রয়েছে পেশাদার সংগীত প্রযোজনা, রেকর্ডিং, প্রচারণা এবং রয়্যাল অ্যালবার্ট হলের এলগার রুমে নিজস্ব সংগীত পরিবেশনার সুযোগ। পরবর্তী ধাপে জুনে অনুষ্ঠিত সরাসরি অডিশনে অংশ নেওয়া ২৫ জনের মধ্যেও নাভহান জায়গা করে নেয়। সেখান থেকে নির্বাচিত নাভহানসহ ৯ প্রতিযোগী চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেন।
২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া নাভহান বর্তমানে হ্যারো স্কুলের শিক্ষার্থী। ১৩ বছর বয়সে সংগীতবৃত্তির মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া নাভহান এখন পিয়ানো ও চেলো বাদ্যযন্ত্রে ডিপ্লোমা পর্যায়ের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এর আগে সে ব্রেন্টউড স্কুলের শিক্ষার্থী ছিল এবং লন্ডনের গিল্ডহল স্কুল অব মিউজিক অ্যান্ড ড্রামাতেও প্রশিক্ষণ নিয়েছে। তার রয়েছে সুর নির্ভুলভাবে শনাক্ত করার বিশেষ দক্ষতা বা ‘পারফেক্ট পিচ’। সেটি কণ্ঠসংগীত, যন্ত্রসংগীত কিংবা উভয়ের সমন্বয়ে হতে পারে। ইতিমধ্যে সংগীতশিল্পের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছ থেকে পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ পেয়েছে সে। ১৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের ভর্তিপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংগীতবৃত্তি পেয়ে এই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুযোগ পায় নাভহান।
সংগীতের প্রতি নাভহানের আগ্রহ শুরু হয় আট বছর বয়স থেকে।
তার বাবা মোহাম্মদ চৌধুরী (ভুলন চৌধুরী) দিনাজপুরের সন্তান এবং মা রুবেনা চৌধুরী সিলেটের বাসিন্দা।
তারা যথাক্রমে ১৯৯৪ ও ১৯৭৯ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন।
রুবেনা চৌধুরী নিজেও সংগীত অনুরাগী এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে প্রশিক্ষিত।
নাভহানের বোনও সংগীতচর্চায় যুক্ত ছিলেন, যা তাকে ছোটবেলা থেকে অনুপ্রাণিত করেছে।
এছাড়া তার পরিবারের সাথে বাংলাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী মাহমুদুন্নবী ও গীতিকার কাওসার আহমেদ চৌধুরীর আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল।
মাত্র ১৩ বছর বয়সেই নাভহান লন্ডনের ঐতিহাসিক ড্রেপার্স হলে সিটি অব লন্ডন করপোরেশনের বিনিয়োগ কমিটির বার্ষিক নৈশভোজে নিজের সুর পরিবেশন করে অভূতপূর্ব সাড়া ফেলেছিল। সে হ্যারো স্কুলের বায়রন কনসোর্ট চেম্বার কয়ার, সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা ও বিগ ব্যান্ডের নিয়মিত সদস্য। ধ্রুপদি সংগীতের পাশাপাশি জ্যাজ, পপ ও রক ঘরানার গানেও তার সমান আগ্রহ রয়েছে। শোপাঁ, রাখমানিনভ ও লিস্টের মতো সুরকারদের সৃষ্টিকর্ম তাকে প্রতিনিয়ত নতুন কিছু তৈরিতে উৎসাহিত করে। বিখ্যাত সুরকার ফ্রেদেরিক শোপাঁ, সের্গেই রাখমানিনভ ও ফ্রানৎস লিস্ট তাঁর সংগীতচর্চার অনুপ্রেরণা। তবে শুধু ধ্রুপদি সংগীতেই তার আগ্রহ সীমাবদ্ধ নয়। অল্প বয়সেই সংগীতের সব গ্রেড পরীক্ষায় ‘ডিস্টিংশন’ অর্জন করেছে নাভহান।