মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র, ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরও গভীর
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত যত তীব্র হচ্ছে, ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও তত গভীর হচ্ছে। একসময় ফিলিস্তিনের অধিকার ও স্বার্থের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেওয়া ভারত এখন ইসরায়েলের সঙ্গে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করেছে।
নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ ও ‘দ্য হিন্দু’র আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক স্ট্যানলি জনির মতে, এটি শুধু রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক পরিবর্তন নয়; বরং কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
অস্ত্র সরবরাহে ভারতের নতুন ভূমিকা
সম্প্রতি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক তদন্তে উঠে এসেছে, ইসরায়েলের অস্ত্র সরবরাহ ব্যবস্থায় ভারত এখন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠেছে। আগে ভারত ছিল ইসরায়েলি অস্ত্রের অন্যতম বড় ক্রেতা। কিন্তু যৌথ উদ্যোগ ও উৎপাদন অংশীদারত্বের মাধ্যমে এখন ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ইসরায়েলের অস্ত্র উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।
অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় কোম্পানিগুলো—যার মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানও রয়েছে—ইসরায়েলি সামরিক সরবরাহকারীদের কাছে ড্রোনের ওয়ারহেড, কামানের গোলার খোলস, ছোট অস্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং সামরিক যানবাহনের বিভিন্ন উপাদান সরবরাহ করেছে। এসব উপাদান গাজায় ব্যবহৃত অস্ত্রে পৌঁছানোর ঝুঁকি রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বাণিজ্য তথ্য বিশ্লেষণ করে অ্যামনেস্টি বলেছে, ভারতীয় কারখানা থেকে ইসরায়েলি সামরিক সরবরাহকারীদের কাছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের যন্ত্রাংশ পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ছিল—
সামরিক মানের ছোট অস্ত্রের ৩ লাখ ৯০ হাজার ৫১৬টি যন্ত্রাংশ
বিস্ফোরক অস্ত্রের ৫ লাখ ৬৪ হাজার ৯৭০টি যন্ত্রাংশ
সামরিক যানবাহনের ২৯৮টি উপাদান।
পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থানের বিপরীতে ভারত
গাজা যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগের কারণে ব্রিটেনসহ বেশ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহ সীমিত বা নিষিদ্ধ করেছে। তাদের আশঙ্কা, এসব অস্ত্র আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনে ব্যবহৃত হতে পারে। তবে ইসরায়েলে বড় পরিমাণ অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আরেকটি কমিশন পরে অভিযোগ করে, ফিলিস্তিনি শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করার মাধ্যমে গণহত্যা অব্যাহত রয়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।
তবে এসব অভিযোগের পরও ভারতে অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনকে ঘিরে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিতর্ক বা জনমত তৈরি হয়নি। স্ট্যানলি জনির মতে, এর পেছনে মোদির ভোটারদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তার ভাষায়, হিন্দুত্ব ও জায়নবাদের মধ্যে একটি স্পষ্ট আদর্শিক মিল তৈরি হয়েছে।
মোদি-নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক জোরদার করেছেন। ২০১৭ সালে মোদি প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইসরায়েল সফর করেন। চলতি বছরও ইসরায়েল সফর করেন তিনি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা শুরুর মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে তার এই সফর শেষ হয়।
সফরের সময় মোদি ও নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠতা এবং ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর ভারতের তুলনামূলক নীরব প্রতিক্রিয়া দেশটির রাজনৈতিক অবস্থানের একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়েছে। পরে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে মন্তব্য করলে নেতানিয়াহু বলেন, ভারতের মতো আরও বন্ধু ইসরায়েলের রয়েছে এবং দেশটিতে ইসরায়েলের প্রতি ব্যাপক সমর্থন রয়েছে।
অস্ত্র রপ্তানি নিয়ে ভারতের অবস্থান
ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহের বিষয়ে ভারত সরকার সরাসরি বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ২০২৪ সালে সংসদে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানান, এ সংক্রান্ত তথ্য জনসমক্ষে নেই এবং সামরিক পণ্য রপ্তানি ‘জাতীয় স্বার্থের’ ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তিনটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ভারতীয় প্রতিষ্ঠান—মিউনিশনস ইন্ডিয়া লিমিটেড, ইন্ডিয়া অপটেল লিমিটেড এবং অ্যাডভান্সড উইপনস অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট ইন্ডিয়া লিমিটেড—ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত বলে চিহ্নিত করেছে। সংস্থাটির মতে, এর ফলে গাজায় চলমান গণহত্যায় ভারতের ‘সহযোগী হয়ে পড়ার’ ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির রপ্তানি জাতীয় আইন ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার অধীনেই পরিচালিত হয়।
ভারতে বিরোধিতা সীমিত
ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতার বিরুদ্ধে মূলত মানবাধিকারকর্মী, শিক্ষার্থী সংগঠন, শ্রমিক ইউনিয়ন, বামপন্থী দল ও কংগ্রেসের মতো বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো কথা বলেছে। ২০২৪ সালে কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা, অধিকারকর্মী ও শিক্ষাবিদ ভারতের ইসরায়েলে সামরিক পণ্য রপ্তানি বন্ধের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন। আদালত সেই আবেদন খারিজ করে জানায়, বিষয়টি নির্বাহী বিভাগের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে।
স্ট্যানলি জনির মতে, ইসরায়েল সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও দেশটির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের জনরোষ দেখা যায়নি। তার মতে, এটি ভারতের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিতর্কে নৈতিক বিবেচনার গুরুত্ব কমে যাওয়ার ইঙ্গিত।
ইসরায়েলে ভারতীয় শ্রমিকও বাড়ছে
অস্ত্রের পাশাপাশি ইসরায়েলে ভারতীয় শ্রমিকের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর অনেক ফিলিস্তিনি শ্রমিককে ইসরায়েলে প্রবেশে বাধা দেওয়া হলে তাদের জায়গায় ভারতীয় শ্রমিকরা কাজ করতে শুরু করেন।
ভারত সরকার গত বছর সংসদে জানিয়েছিল, ২০২৩ সালের নভেম্বরে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তির পর নির্মাণ ও পরিচর্যা খাতে ২০ হাজারের বেশি ভারতীয় শ্রমিক ইসরায়েলে গেছেন।
ইসরায়েলি অস্ত্রের বড় ক্রেতা ভারত
একই সময়ে ভারত নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে ইসরায়েল থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রও কিনেছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ভারত ছিল ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা ক্রেতা। ওই সময়ে ইসরায়েলের মোট অস্ত্র বিক্রির ২৯ শতাংশই গেছে ভারতে।
তবে এই ঘনিষ্ঠতার মূল্যও ভারতকে দিতে হতে পারে বলে মনে করছেন স্ট্যানলি জনি। ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলে এর বিস্তৃত অর্থনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে, যেখানে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় প্রবাসী বসবাস করেন।
তার মতে, ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ বজায় রাখা প্রয়োজন হলেও পশ্চিম এশিয়া নীতিতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা জরুরি। একই সঙ্গে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ আরও দৃঢ়ভাবে রক্ষা করতে হবে।