তালেবানের অন্দরে যেভাবে ক্ষমতার কোন্দল ছড়িয়ে পড়ছে
নিউজ ডেস্ক
জাবুল প্রদেশের উপগভর্নরের পদ থেকে তাজিক কমান্ডার হাজি জুম্মা খান ফাতেহকে সরিয়ে দিয়েছে তালেবান। প্রশাসনিক রদবদল হিসেবে বিষয়টি দেখার সুযোগ থাকলেও এর পেছনে তালেবানের শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করার প্রবণতা রয়েছে বলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন।
ফাতেহ বাদাখশানের একজন প্রভাবশালী তাজিক কমান্ডার হিসেবে পরিচিত এবং সেখানে তাঁর নিজস্ব নেটওয়ার্ক ও প্রভাব রয়েছে।
বাদাখশানে স্থানীয় কর্তৃত্ব ও সোনার খনির নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে ফাতেহর সঙ্গে তালেবান নেতৃত্বের বিরোধ তৈরি হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর পর তাঁকে বাদাখশান থেকে সরিয়ে জাবুলের উপগভর্নর করা হয়। পরে ২০২৬ সালের জুনে তাঁকে ওই পদ থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়।
ফাতেহর ঘটনা তালেবানের অভ্যন্তরে জাতিগত ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তালেবান আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের সময় তাজিক ও উজবেকসহ অ-পশতুন কমান্ডারদের ব্যবহার করেছিল। কিন্তু এসব কমান্ডারের নিজস্ব সামরিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রভাব কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠলে তাঁদের ক্ষমতা সীমিত করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ রয়েছে।
পশতুনদের আধিপত্য
তালেবানের শাসন কাঠামোয় পশতুনদের প্রাধান্য দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার বিষয়। বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদগুলোতে পশতুনদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি। এর ফলে তাজিক, উজবেক ও হাজারা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তালেবানের সামরিক কাঠামোয় অবশ্য তাজিক কমান্ডারদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁদের মধ্যে কারি ফাসিহউদ্দিন ফিতরাত অন্যতম। তিনি তালেবানের সেনাপ্রধান এবং বাদাখশানের তাজিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর শক্তিশালী যোগাযোগ রয়েছে।
তবে ফাতেহর মতো স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী কমান্ডারদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সম্পর্ক সবসময় মসৃণ নয়। বিশেষ করে স্থানীয় সম্পদ, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে।
বাদাখশানের খনিজ সম্পদ ঘিরে বিরোধ
বাদাখশান আফগানিস্তানের অন্যতম খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চল। বিশেষ করে সোনার খনি ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে। ফাতেহর সঙ্গে তালেবান নেতৃত্বের বিরোধের অন্যতম কারণ হিসেবে খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ফাতেহর অপসারণের পর বাদাখশানে তাঁর অনুগত সশস্ত্র লোকজনকে নিরস্ত্র করার উদ্যোগও নেওয়া হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ফাতেহকে ঘিরে তালেবানের সঙ্গে বিরোধ আরও প্রকাশ্য হয়েছে এবং তিনি তালেবানবিরোধী অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
বাড়ছে অভ্যন্তরীণ চাপ
তালেবান ২০২১ সালে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর দেশটির ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে বাদাখশানে তালেবানবিরোধী তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে ওই অঞ্চলে তালেবান কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
এ পরিস্থিতিতে জুম্মা খান ফাতেহর মতো স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী কমান্ডারদের সঙ্গে তালেবান নেতৃত্বের দ্বন্দ্বকে শুধু প্রশাসনিক রদবদল হিসেবে দেখার সুযোগ কমছে। স্থানীয় ক্ষমতা, সামরিক প্রভাব এবং খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি বিষয়কে ঘিরে বিরোধ ভবিষ্যতে তালেবানের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
আফগানিস্তানে ক্ষমতা যত বেশি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, ততই স্থানীয় প্রভাবশালী কমান্ডারদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। আর এই দূরত্ব দীর্ঘস্থায়ী হলে তা তালেবানের অভ্যন্তরীণ বিভাজন আরও গভীর করতে পারে।