যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষ নিয়ে বিতর্ক, ইসরায়েলকে ঘিরে প্রশ্ন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য ও রাজনৈতিক প্রচারণা ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। দেশটির রিপাবলিকান রাজনীতির একটি অংশে মুসলিমদের পাশাপাশি অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে নিয়েও নেতিবাচক প্রচারণা বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ পরিস্থিতির পেছনে রাজনৈতিক বিভাজন এবং ইসরায়েলকেন্দ্রিক প্রচারণার ভূমিকা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি এক রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্যের কার্যালয়ের এক কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে লেখক জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলনীতি এবং রিপাবলিকান পার্টির কিছু সদস্যের এ সম্পর্ক নিয়ে সংশয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। বৈঠকের শেষ দিকে নতুন গঠিত ‘শরিয়া-ফ্রি আমেরিকা ককাস’-এ ওই কংগ্রেস সদস্যের অংশগ্রহণের বিষয়টি উঠে আসে।
ককাসটির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ইসলামকে সহিংসতা, নারীর ওপর নিপীড়ন এবং রাজনৈতিক আধিপত্যের সঙ্গে যুক্ত করে এর বিরোধিতা করার কথা বলেছেন। তবে ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, সংগঠনটির বক্তব্যের লক্ষ্য শুধু মুসলিমরা নয়; এর মাধ্যমে ভারতীয় ও অন্যান্য বাদামি বর্ণের মানুষ এবং ইহুদিদের বিরুদ্ধেও বিদ্বেষ ছড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
লেখাটিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষের প্রবণতা এখন আগের তুলনায় আরও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে। এর বিপরীতে সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর একটি মসজিদে গিয়ে ইসলামকে শান্তির ধর্ম হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তবে বর্তমান রিপাবলিকান রাজনীতিতে এমন অন্তর্ভুক্তিমূলক বক্তব্য অনেকটাই কমে গেছে বলে লেখকের দাবি।
ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্যের প্রভাব হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। গত মে মাসে সান ডিয়েগোর একটি ইসলামিক সেন্টারে গুলির ঘটনায় দুই মুসল্লি ও একজন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হওয়ার ঘটনাকে এর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
লেখাটিতে আরও বলা হয়, মুসলিমদের নামাজের আগে অজু করার সুবিধার্থে ডালাস-ফোর্ট ওয়ার্থ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশেষ পা ধোয়ার স্থান তৈরির একটি প্রস্তাবও রাজনৈতিক সমালোচনার মুখে বাতিল করা হয়।
এই ইসলামবিদ্বেষের পেছনে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রভাব নিয়েও লেখায় আলোচনা করা হয়েছে। লেখকের মতে, ট্রাম্পের রাজনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর অবস্থান হুমকির মুখে—এমন ধারণা তুলে ধরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন তৈরি করা হয়েছে। এর প্রভাব শুধু মুসলিমদের ওপর নয়, কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
লেখাটিতে ইসরায়েলের ভূমিকার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে জেরুজালেমে ইসরায়েল আয়োজিত একটি ইহুদিবিদ্বেষবিরোধী সম্মেলনে ইউরোপের বিভিন্ন ডানপন্থী রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সেখানে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইউরোপের উগ্র ডানপন্থীদের সঙ্গে ‘র্যাডিক্যাল ইসলাম’-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বিষয়টি তুলে ধরেন।
এরপরও নেতানিয়াহু বিভিন্ন বক্তব্যে ইসলাম ও মুসলিমদের নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেছেন বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষায় জনসংযোগ ও প্রচারণার ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
লেখকের মতে, গাজা যুদ্ধের কারণে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দেশটি নিজেদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনার জবাব দেওয়ার পাশাপাশি সমালোচকদের দুর্বল করতে প্রচারণার পথ বেছে নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে পশ্চিমা দেশগুলোতে ‘র্যাডিক্যাল ইসলাম’ ও ‘জিহাদিজম’ নিয়ে ভয় তৈরির কৌশল ব্যবহারের অভিযোগও আনা হয়েছে।
২০২৪ সালে কানাডাতেও ইসরায়েল-সমর্থিত একটি প্রভাব বিস্তারকারী প্রচারণার মাধ্যমে মুসলিম অভিবাসীদের নিয়ে নেতিবাচক ধারণা ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছিল বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব প্রচারণা সব জায়গায় সফল হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম প্রার্থীদের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সাফল্যকে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়ার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
লেখাটির শেষাংশে বলা হয়েছে, ভয় ও বিদ্বেষ রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হাতিয়ার হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর ফলাফল অনিশ্চিত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের জনগণের উচিত এ ধরনের প্রচারণাকে সতর্কভাবে বিশ্লেষণ করা এবং বহুত্ববাদ ও সব নাগরিকের সমান অধিকারের প্রশ্নে সচেতন থাকা।