|
|
রবিবার, ০১ নভেম্বর, ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সর্বস্বত্ব মুখপত্র কর্তৃক সংরক্ষিত

বিজ্ঞাপন | ব্যানার স্পট

আপনার ব্যবসার প্রসারে আমাদের জনপ্রিয় নিউজ ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দিন!

বিজ্ঞাপন দিন →

৮৭ টাকার মাল্টা কীভাবে ৫২০ টাকা হলো?

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ : ০১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:২৫ পিএম
১৬৩ পঠিত
00:00
00:00
৮৭ টাকার মাল্টা কীভাবে ৫২০ টাকা হলো?
খুচরা দোকানে বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে মাল্টা স্টেশন সড়ক এলাকায়।ছবি: প্রথম আলো

বাজারে বিক্রি হওয়া হলুদ মাল্টার বড় অংশ আমদানি করা হয় দক্ষিণ আফ্রিকা ও মিসর থেকে। এসব দেশ থেকে প্রতি কেজি মাল্টা প্রায় ৭০ সেন্ট বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮৭ টাকা পর্যন্ত দামে আমদানি করছেন ব্যবসায়ীরা। তবে চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে সেই মাল্টাই এখন বিক্রি হচ্ছে ৪৮০ থেকে ৫২০ টাকা কেজি দরে।

অর্থাৎ আমদানি পর্যায়ে ৮৭ টাকা মূল্যের একটি মাল্টা ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে গিয়ে পাঁচ গুণেরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

আমদানি থেকে শুরু করে খুচরা বাজার পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, দামের বড় অংশ বাড়ছে আমদানি পর্যায়েই। মাল্টার ওপর বর্তমানে মোট শুল্ক-কর ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে পরিবহন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়া এবং ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ায় ফলটির চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় পাইকারি ও খুচরা পর্যায়েও দাম বেড়েছে।

৮৭ টাকার মাল্টায় শুল্ক-কর ১০৭ টাকা

বাংলাদেশ কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, কমলা ও মাল্টাজাতীয় তাজা ফল আমদানিতে মোট করভার ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর মধ্যে আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং অগ্রিম আয়কর রয়েছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের আমদানি তথ্য বলছে, বর্তমানে প্রতি কেজি মাল্টার গড় আমদানি মূল্য প্রায় ৮৭ টাকা। এর ওপর শুল্ক ও কর দিতে হয় প্রায় ১০৭ টাকা। ফলে বন্দর থেকে পণ্য খালাসের সময়ই প্রতি কেজি মাল্টার খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১৯৩ থেকে ১৯৪ টাকা।

আমদানির পর মাল্টা হিমায়িত কনটেইনারে পরিবহন করা হয়। বন্দর থেকে গুদামে নেওয়া, কনটেইনার ব্যবস্থাপনা ও পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ যোগ হয়ে আরও ১০ থেকে ১৫ টাকা বাড়ে। এতে সরাসরি হিসাব অনুযায়ী খরচ দাঁড়ায় ২০৪ থেকে ২০৯ টাকা।

তবে আমদানিকারকদের দাবি, মাল্টা পচনশীল হওয়ায় প্রকৃত ব্যয় আরও বেশি। ফল নষ্ট হওয়া, কনটেইনার ও বন্দরসংক্রান্ত খরচসহ সবকিছু মিলিয়ে তাদের কেজিপ্রতি ব্যয় প্রায় ২৩০ থেকে ২৪০ টাকা পর্যন্ত হয়।

শুল্ক বাড়ার পর কমেছে আমদানি

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, শুল্ক-কর বৃদ্ধির পর দেশে মাল্টার আমদানি ধারাবাহিকভাবে কমেছে।

২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে প্রায় ২ লাখ ৯৪ হাজার টন মাল্টা আমদানি হয়েছিল। পরের অর্থবছরে কর বাড়ার পর আমদানি কমে ২ লাখ ২০ হাজার টনে নেমে আসে।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি আরও কমে ১ লাখ ৭৩ হাজার টনে দাঁড়ায়। এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৬৮ হাজার এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ লাখ ৫৩ হাজার টন মাল্টা আমদানি হয়েছে।

অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে দেশে মাল্টার আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। চলতি অর্থবছরেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অর্থবছরের প্রথম প্রায় তিন মাসে আমদানি হয়েছে মাত্র ২১ হাজার টন।

কয়েক ধাপ পেরিয়ে দাম ৫২০ টাকা

বন্দর থেকে খালাসের পর মাল্টা চট্টগ্রাম ও ঢাকার বিভিন্ন পাইকারি বাজারে যায়। সেখান থেকে তা পৌঁছে খুচরা বিক্রেতাদের হাতে। প্রতিটি পর্যায়ে চাহিদা ও সরবরাহের ওপর ভিত্তি করে দামে পরিবর্তন আসে।

চট্টগ্রামের ফলমন্ডির ব্যবসায়ীরা জানান, প্রায় তিন সপ্তাহ আগেও পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি মাল্টা ২২০ থেকে ২৩০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই দাম বাড়তে থাকে।

একপর্যায়ে ১৫ কেজির একটি কার্টন ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ পাইকারি পর্যায়েই প্রতি কেজির দাম ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় উঠে যায়।

গত বুধবার চট্টগ্রামের বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে প্রতি কেজি মাল্টা ৪৮০ থেকে ৫২০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা যায়।

রেলওয়ে মেন্স সুপার মার্কেটের ফল ব্যবসায়ী মো. বাবুল জানান, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত অনেক আমদানিকারক লোকসানের মুখে পড়েছিলেন। এর ফলে পরবর্তী সময়ে আমদানি কমে যায়। সেপ্টেম্বর মাসে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দাম দ্রুত বাড়ে। তবে নতুন চালান আসতে শুরু করায় এখন দাম কিছুটা কমছে বলে জানান তিনি। তার আশা, আগামী সপ্তাহে সরবরাহ বাড়লে দাম আরও কমতে পারে।

মাল্টা আমদানিকারক এইচআর করপোরেশনের কর্ণধার মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিন বলেন, শুল্ক-কর, বন্দর মাশুল ও কনটেইনার পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই খরচ বেড়েছে। তবে তার দাবি, আমদানিকারক বা পাইকারি পর্যায়ের দামের তুলনায় খুচরা বাজারে অনেক ক্ষেত্রে কেজিপ্রতি প্রায় ১০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।

কয়েক বছরে বেড়েছে ফলের করভার

মাল্টাসহ আমদানি করা ফলের ওপর বর্তমানের মতো এত বেশি করভার আগে ছিল না। ২০২১-২২ অর্থবছরে এসব ফলে মোট করভার ছিল প্রায় ৮৯ শতাংশ।

ডলার সংকটের সময় আমদানি নিরুৎসাহিত করতে ২০২২ সালের মে মাসে ফলসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ফল আমদানিতে করের চাপ আরও বাড়ে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের এক পর্যায়ে মোট করভার ১৩৬ দশমিক ২০ শতাংশে পৌঁছেছিল। পরে তা কিছুটা কমানো হয়। বর্তমানে কমলা, মাল্টা, আপেল ও আঙুরের মতো কয়েকটি ফলে মোট করভার ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মাল্টার দাম অপরিবর্তিত থাকলেও দেশের বাজারে প্রবেশের আগেই করের কারণে এর দাম দ্বিগুণের বেশি হয়ে যায়।

ডেঙ্গুর সময় বাড়তি চাহিদা

মাল্টার দাম বাড়ার সময় দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপও বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি বছরে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৯ হাজার ৬২০ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ২৪৫ জন। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর মাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।

ফল ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, জ্বর ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীদের জন্য পরিবারের সদস্যরা মাল্টা ও কমলার মতো ফল বেশি কিনছেন। ফলে বাজারে চাহিদা বেড়েছে। এর সঙ্গে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম আরও বেড়েছে।

একদিকে আমদানি মূল্যের ওপর বড় অঙ্কের শুল্ক-কর, অন্যদিকে পরিবহন ও ব্যবসায়িক খরচ—সব মিলিয়ে মাল্টার দাম বাড়ছে। এর সঙ্গে চাহিদা-সরবরাহের ব্যবধান তৈরি হওয়ায় খুচরা বাজারে দাম আরও ওপরে উঠেছে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ বলেন, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। বাজারে অভিযানও পরিচালনা করা হয়েছে। বুধবার ফলমন্ডিতে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ১৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন | ব্যানার স্পট

আপনার ব্যবসার প্রসারে আমাদের জনপ্রিয় নিউজ ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দিন!

বিজ্ঞাপন দিন →