|
|
রবিবার, ০১ নভেম্বর, ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সর্বস্বত্ব মুখপত্র কর্তৃক সংরক্ষিত

বিজ্ঞাপন | ব্যানার স্পট

আপনার ব্যবসার প্রসারে আমাদের জনপ্রিয় নিউজ ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দিন!

বিজ্ঞাপন দিন →

যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০১:৩৩ পিএম
২১ পঠিত
00:00
00:00
যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডা
যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করছে কানাডা-ছবি/ বিবিসি

গত সপ্তাহে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি স্বীকার করেছেন, তিনি এমন একটি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন, যা একসময় কল্পনাও করা যেত না—যুক্তরাষ্ট্রের কানাডা আক্রমণ।

তিনি বলেন, এই ঝুঁকি কম এবং এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা অত্যন্ত নগণ্য। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট থাকাকালে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হওয়ার প্রেক্ষাপটে সব ধরনের সম্ভাবনা বিবেচনা করার দায়িত্ব তার রয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি এ কথা বলেন।

কার্নি বলেন, ‘এটা আসলে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিষয়।’

ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্কনীতি এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার তার বারবার করা ইচ্ছা কানাডাকে সম্ভাব্য মার্কিন হামলার পরিস্থিতি নিয়ে সামরিক মহড়া বা পরিকল্পনা করতে বাধ্য করেছে।

২০২৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র কখনো কানাডার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করবে—এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা ‘খুবই কম’। এর পরিবর্তে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে তিনি অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখবেন বলে জানিয়েছিলেন।

এ সপ্তাহে বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউস বলেছে, ‘কানাডার মহান জনগণকে সুরক্ষা দিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চেয়ে বেশি কেউ কিছু করেননি।’

বিবিসির সঙ্গে কথা বলা সামরিক বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন, কানাডায় মার্কিন হামলার সম্ভাবনা খুবই কম। দুই দেশ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে একসঙ্গে কাজ করে—এ বিষয়টিও তারা উল্লেখ করেছেন।

তবে বিষয়টি যে কানাডীয়দের মনে উদ্বেগ তৈরি করছে, তা স্পষ্ট।

জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর লেজার পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ৩০ শতাংশের বেশি কানাডীয় মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কানাডা আক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে।

কেন এটি হওয়ার সম্ভাবনা কম

কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ হলে পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হবে এবং এমনটা কল্পনা করাও প্রায় কঠিন—বলেছেন কানাডার রয়্যাল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সের ৩৪ বছরের সাবেক সামরিক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল ক্রিস্টোফার কোটস।

তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘আমি পুরো কর্মজীবন সামরিক অভিযানে যুক্ত ছিলাম। কিন্তু আমরা কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড থেকে সামরিক হামলা আসতে পারে—এমন সম্ভাবনা বিবেচনা করিনি।’

ন্যাটো মিশনে দায়িত্ব পালন করা কোটস বলেন, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে।

দুই দেশই উত্তর আটলান্টিক প্রতিরক্ষা জোট ন্যাটোর সদস্য। জোটের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যদের তাকে রক্ষায় এগিয়ে আসতে হয়।

দুই দেশ নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ড বা নোরাডের অধীনে আর্কটিক অঞ্চলে যৌথ প্রতিরক্ষা অভিযানও পরিচালনা করে। পাশাপাশি তারা নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করে।

এ কারণে কোটস মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র কানাডায় হামলা চালালে তা সরাসরি সশস্ত্র আক্রমণ দিয়ে শুরু নাও হতে পারে। বরং সাইবার যুদ্ধের মতো আরও গোপন পদ্ধতি দিয়ে শুরু হতে পারে।

সবসময় সেরা বন্ধু ছিল না

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ২০ শতকের শেষভাগে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র স্বাভাবিক মিত্রে পরিণত হয়। অর্থনীতি, সামরিক ও সংস্কৃতির দিক থেকেও দুই দেশ গভীরভাবে একীভূত হয়েছে।

তবে সবসময় এমন ছিল না। কানাডিয়ান ওয়ার মিউজিয়ামের গবেষক টিম ফোরান বলেন, ১৮ ও ১৯ শতকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রসারণবাদের বিরোধিতা কানাডার পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে ভয় পাওয়ার বিষয়টি কানাডার রাজনৈতিক প্রকল্পের ভিত্তির অংশ।’

কানাডা ব্রিটিশ উত্তর আমেরিকার কয়েকটি উপনিবেশ নিয়ে গঠিত হয়েছিল। আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশগুলো ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলেও এসব উপনিবেশ ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রতি অনুগত ছিল।

কানাডা গঠনের আগে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশ উত্তর আমেরিকার উপনিবেশগুলোতে হামলার চেষ্টা করেছিল। ১৭৭৫ সালে তারা মন্ট্রিয়ল দখল করে এবং কুইবেক সিটি প্রায় জয় করে ফেলেছিল।

১৮১২ সালের যুদ্ধে আমেরিকানরা তৎকালীন আপার কানাডা, লোয়ার কানাডা ও সমুদ্র উপকূলীয় উপনিবেশগুলোতে বারবার হামলা চালায়। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ অমীমাংসিত অবস্থায় শেষ হয়। ওই যুদ্ধে ব্রিটিশ সেনারা প্রতিশোধ হিসেবে হোয়াইট হাউস পুড়িয়ে দিয়েছিল।

ফোরান বলেন, সে সময় পরবর্তীতে কানাডায় পরিণত হওয়া উপনিবেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য গ্রেট ব্রিটেন ও তার রয়্যাল নেভির ওপর নির্ভর করত। পাশাপাশি বড় বড় যুদ্ধে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্যরাও জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান শক্তি ও প্রভাবের কারণে কানাডা আবার দেশটির সঙ্গে যুদ্ধের সম্ভাবনা বিবেচনা করেছিল।

তখন কানাডা একটি পরিকল্পনা তৈরি করে। সীমান্তবর্তী শহরগুলোতে কানাডার সেনাবাহিনীর জেনারেলরা গোপনে সফর করতেন। তারা পর্যটকের পরিচয়ে গিয়ে সেতু ও মহাসড়কের ছবি তুলতেন এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতেন।

তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গেও কথা বলতেন, যাতে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ সম্পর্কে আরও ভালো ধারণা পাওয়া যায়।

কানাডিয়ান ওয়ার মিউজিয়ামের ২০ শতকের কানাডা বিষয়ক গবেষক অ্যান্ড্রু বার্চ বলেন, তখনও যুদ্ধের সম্ভাবনা খুবই কম ছিল। কিন্তু কানাডীয়রা প্রস্তুত থাকতে চেয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘সামরিক বাহিনী এ কাজই করে। তারা নানা ধরনের সম্ভাব্য পরিস্থিতি কল্পনা করে।’

যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করলে কী হতে পারে

যুক্তরাষ্ট্রের কানাডা আক্রমণ অত্যন্ত অসম্ভাব্য হলেও কানাডা প্রস্তুতি নিচ্ছে—এটি বৈশ্বিক ব্যবস্থায় কতটা বড় পরিবর্তন এসেছে তারই ইঙ্গিত বলে মনে করেন কানেকটিকাটের ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাভেনের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক ম্যাথিউ শ্মিট।

তিনি বলেন, কানাডার নেতাদের এখন কঠিন কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে—তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কতটা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ চালিয়ে যেতে চান। কারণ এই অংশীদারিত্ব তাদের এমন মূল্যবান তথ্য দেয়, যা প্রয়োজনে কানাডার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষতি করছে এবং এখানে একটি বৈধ ধরনের ভয় রয়েছে।’

শ্মিট বলেন, আমেরিকানরা কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার বিষয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যকে হয়তো গুরুত্বের সঙ্গে নাও নিতে পারেন। কিন্তু কানাডীয়রা বিষয়টি স্পষ্টভাবেই গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং প্রয়োজন হলে নিজেদের রক্ষার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।

তাহলে সত্যিই যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, কী হতে পারে?

যুদ্ধের প্রথম ধাপ খুব অল্প সময়ের হতে পারে।

চলতি বছরের শুরুতে গ্লোব অ্যান্ড মেইল পত্রিকার প্রতিবেদনে কানাডার সামরিক বাহিনীর একটি মডেলের কথা তুলে ধরা হয়। সেই মডেল অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে এক সপ্তাহের মধ্যেই কানাডার কৌশলগত অবস্থানগুলো বিপর্যস্ত হয়ে যেতে পারে।

কানাডার সামরিক বাহিনী দ্রুত সংখ্যায় পিছিয়ে পড়বে এবং তাদের গেরিলা ধরনের যুদ্ধের কৌশল গ্রহণ করে প্রতিপক্ষকে প্রতিহত করার চেষ্টা করতে হবে।

জানুয়ারিতে সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে পত্রিকাটি জানিয়েছিল, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মতো মিত্র দেশগুলোর কাছে কানাডার জন্য সহায়তা ও প্রতিরক্ষা দেওয়ার আহ্বান জানানো হতে পারে।

ধারণাগত এই মডেলটি প্রায় এক শতাব্দীর মধ্যে প্রথমবারের মতো কানাডার পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরিকল্পনা বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে কোটস বলেন, এই মডেল সামরিক যুদ্ধ পরিকল্পনার তুলনামূলক হালকা পর্যায়ের।

তিনি বলেন, ন্যাটোর মিত্রদের তুলনায় কানাডা স্থল আক্রমণের ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া জানানোর পরিকল্পনা তৈরিতে পিছিয়ে রয়েছে। অনিশ্চিত ভূরাজনীতির এই সময়ে দেশটি এখন সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে।

সম্প্রতি কানাডার প্রতিরক্ষা প্রধান সামরিক বাহিনীর আকার ব্যাপকভাবে বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে ৩ লাখ পর্যন্ত স্বল্প প্রশিক্ষিত বেসামরিক সৈন্য যুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকেও কানাডা আক্রমণ সহজ হবে না।

শ্মিট বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি অনেক বড় হলেও কানাডার সঙ্গে যুদ্ধের পক্ষে আমেরিকানদের সমর্থন পাওয়া কঠিন হবে।

তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, কানাডায় আক্রমণের নির্দেশ দেওয়া হলে বিপুলসংখ্যক মার্কিন কর্মকর্তা পদত্যাগ করবেন।’

‘তারা এটিকে বেআইনি ও অনৈতিক নির্দেশ হিসেবে দেখবেন।’

শ্মিট বলেন, কানাডীয় ও মার্কিন সেনারা নিয়মিত একসঙ্গে প্রশিক্ষণ নেয় এবং তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান রয়েছে।

তবে দুই দেশের সম্পর্ক যদি এতটাই অবনতি হয় যে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে গড়ায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত কানাডার মূল্যবান তেল ও খনিজ সম্পদ দখল এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার দিকে নজর দিতে পারে।

তিনি বলেন, ‘ভেনেজুয়েলায় সাবেক প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে আটক করতে যুক্তরাষ্ট্র এ বছরের শুরুতে যে সামরিক অভিযান চালিয়েছিল, সেটির সঙ্গে কিছুটা মিল রয়েছে—এমন একটি অভিযান দেখা যেতে পারে।’

তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা বেশি হলেও ‘সমান অনুপাতে’ লড়াই করলে কানাডীয় সেনারা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে বলে মনে করেন শ্মিট। 
 

বিজ্ঞাপন | ব্যানার স্পট

আপনার ব্যবসার প্রসারে আমাদের জনপ্রিয় নিউজ ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দিন!

বিজ্ঞাপন দিন →