চেরনোবিলের ‘ডেড জোনে’ পরিত্যক্ত যানবাহনের রহস্য
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
চেরনোবিল পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর তেজস্ক্রিয়তা মোকাবিলায় বিপুলসংখ্যক গাড়ি, বাস, ট্রাক, হেলিকপ্টার ও বিভিন্ন ধরনের সামরিক যান ব্যবহার করা হয়েছিল। দুর্ঘটনার প্রায় ৪০ বছর পরও এসব যানবাহনের অনেকগুলো ইউক্রেনের চেরনোবিল এক্সক্লুশন জোনের বিভিন্ন এলাকায় পড়ে আছে।
১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল ভোরে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ইউক্রেনে অবস্থিত চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে একটি নিরাপত্তা পরীক্ষা ভয়াবহ দুর্ঘটনার রূপ নেয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রের চারটি রিঅ্যাক্টরের একটি পরীক্ষা চালানোর সময় সেখানে থাকা নকশাগত ত্রুটির কারণে বিদ্যুৎ হঠাৎ বেড়ে যায়।

এরপর রিঅ্যাক্টর নম্বর চার-এর ভেতরের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বাষ্প বিস্ফোরণ ঘটে। এতে রিঅ্যাক্টর ভবন ধ্বংস হয় এবং ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনার সূত্রপাত ঘটে। আগুন ও ধ্বংসস্তূপ থেকে ছড়িয়ে পড়া তেজস্ক্রিয় পদার্থ ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকা ছাড়িয়ে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যান্য অঞ্চলেও পৌঁছে যায়। পরে এর প্রভাব উত্তর ইউরোপের দূরবর্তী এলাকাতেও শনাক্ত হয়।
দুর্ঘটনার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ে চেরনোবিলের আশপাশের এলাকায়। বিশেষ করে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মীদের জন্য গড়ে তোলা প্রিপিয়াত শহরটি দ্রুত খালি করে দেওয়া হয়। প্রায় ৪৯ হাজার বাসিন্দার এই শহর থেকে দুর্ঘটনার ৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই সবাইকে সরিয়ে নেওয়া হয়। আশপাশের আরও কয়েকটি বসতি থেকেও প্রায় ৬৮ হাজার মানুষকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়।

এরপর শুরু হয় দীর্ঘমেয়াদি পরিচ্ছন্নতা অভিযান। তেজস্ক্রিয়তা নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিষ্কারে সোভিয়েত ইউনিয়নের বেসামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহন মোতায়েন করা হয়। প্রায় পাঁচ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মী এই কাজে যুক্ত ছিলেন, যাদের ‘লিকুইডেটর’ নামে অভিহিত করা হয়।
রিঅ্যাক্টরের আগুন নিয়ন্ত্রণ এবং তেজস্ক্রিয় এলাকায় বিভিন্ন কাজ চালাতে বিপুলসংখ্যক হেলিকপ্টার, ট্রাক, বাস, ফায়ার ইঞ্জিন ও সামরিক যান ব্যবহার করা হয়। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার পর নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয় এসব যানবাহন নিয়েই।
তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা এত বেশি ছিল যে অধিকাংশ যানকে এক্সক্লুশন জোনের বাইরে নিয়ে গিয়ে স্বাভাবিক কাজে ফেরানো সম্ভব হয়নি। তাই চেরনোবিলের ভেতরেই যানবাহনগুলোর জন্য আলাদা ‘কবরস্থান’ তৈরি করা হয়। রাসোখা ও বুরিয়াকোভকা এলাকায় বিপুলসংখ্যক যান এনে ফেলে রাখা হয়। অনেক যানকে দীর্ঘ সময় ধরে সেখানেই থাকার কথা ছিল, যাতে ধীরে ধীরে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা কমে আসে।

পরবর্তীতে এসব পরিত্যক্ত যান চেরনোবিলের অন্যতম অদ্ভুত দৃশ্যে পরিণত হয়। ২০০৬ সালে দুর্ঘটনার ২০ বছর পূর্তিকে সামনে রেখে বিবিসির সাবেক অনলাইন নিউজ ফটো এডিটর ফিল কুমস রাসোখা যানবাহন কবরস্থান পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি সারি সারি ফায়ার ইঞ্জিন, বাস এবং বিশাল আকৃতির হেলিকপ্টার দেখতে পান।
তার তোলা ছবিতে বিশাল Mi-6 হেলিকপ্টারসহ বিভিন্ন পরিত্যক্ত যান দেখা যায়। তবে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকার পাশাপাশি ধাতব যন্ত্রাংশ চুরি করায় অনেক যানবাহনের কাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও মূল্যবান যন্ত্রাংশের জন্য এসব যান থেকে বিভিন্ন অংশ খুলে নেওয়া হয়েছিল।
২০১৩ সালের দিকে ইউক্রেনের কর্তৃপক্ষ রাসোখার অনেক পুরোনো যানবাহন সরিয়ে নেয়। ফলে আগে যেখানে বিশাল হেলিকপ্টার ও সারি সারি সামরিক যান দেখা যেত, পরে সেই জায়গার বড় অংশ খালি হয়ে যায়। তবে এক্সক্লুশন জোনের বনাঞ্চল ও অন্যান্য এলাকায় এখনো দুর্ঘটনার সময় ব্যবহৃত অনেক তেজস্ক্রিয় যান পড়ে রয়েছে।
পোলিশ আলোকচিত্রী কামিল বুদজিনস্কি ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে একাধিকবার চেরনোবিল এক্সক্লুশন জোনে গেছেন। ২০১৮ সালে রাসোখা পরিদর্শনের সময় তিনি দেখতে পান, আগের প্রধান যানবাহন সংরক্ষণস্থলের বেশিরভাগ অংশই পরিষ্কার করা হয়েছে। পরে স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে কাছাকাছি আরেকটি এলাকায় যানবাহনের অবস্থান শনাক্ত করেন এবং সেখানে গিয়ে বাস ও সামরিক যান দেখতে পান।
চেরনোবিলের পরিত্যক্ত যানবাহন এখন শুধু একটি ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনার স্মৃতিচিহ্ন নয়; এগুলো সেই সময়ের ব্যাপক পরিচ্ছন্নতা অভিযানেরও নিদর্শন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বর্তমানে এক্সক্লুশন জোনে পর্যটকদের প্রবেশও সীমিত। ফলে বনাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকা এসব যান ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে চলেছে