উত্তরার আগুন: ছাদ তালাবদ্ধ থাকায় আটকা পরেন বাসিন্দারা
নিউজ ডেস্ক
ঢাকার উত্তরার একটি আবাসিক ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ছয়জনের কেউই আগুনে পুড়ে মারা যাননি। চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, ঘন ও বিষাক্ত ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে তাদের প্রত্যেকের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে দুই পরিবারের শিশু সদস্যও রয়েছে।
ভবনের দ্বিতীয় তলায় আগুনের সূত্রপাত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে ওপরের তলার বাসিন্দারা নিচে নামতে পারেননি। অন্যদিকে ছাদের দরজায় তালা থাকায় তারা উপরে উঠেও নিরাপদ আশ্রয় নিতে ব্যর্থ হন। ফলে অনেকেই বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে ও চিৎকার করে সাহায্যের আকুতি জানালেও শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাননি।
শুক্রবার সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের ৩৪ নম্বর বাসায় আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। প্রায় দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হলেও ভবনের পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার দুটি পরিবারের মোট ছয়জন প্রাণ হারান। ঘটনাস্থল থেকে ১৬ জনকে উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ছয়তলা ভবনটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় সামনের দিকের ইউনিটে ডুপ্লেক্স করে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বসবাস করতেন বাড়ির মালিক জুয়েল মোল্লা। আগুনের সূত্রপাত ঘটে ভবনের দ্বিতীয় তলায়। ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, রান্নাঘরে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট অথবা গ্যাস লিকেজ থেকে আগুন লাগতে পারে।
উত্তরা ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টাফ অফিসার আলম হোসেন বলেন, “প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। তবে বিষয়টি তদন্তাধীন। এই ঘটনায় কেউ আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যাননি। ছয়জনই ধোঁয়ায় শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে মারা গেছেন।”
তিনি আরও বলেন, “ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার ডুপ্লেক্স ইউনিটে প্রচুর দাহ্য ডেকোরেশন সামগ্রী ছিল। সেগুলো পুড়ে প্রচণ্ড ধোঁয়া তৈরি হয়, যা দ্রুত পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে।”
ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগুন লাগার সময় ভবনের বিভিন্ন তলার বাসিন্দারা বারান্দায় এসে সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিলেন। ছাদের দরজা খোলা থাকলে অনেকেই উপরে উঠে প্রাণে বাঁচতে পারতেন বলে তাদের ধারণা।
প্রত্যক্ষদর্শী শফিক বলেন, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তিনি আগুনের খবর পান। তিনি দেখেন, দ্বিতীয় তলার কর্নার রুমে আগুন জ্বলছে এবং ওপরের তলা থেকে ঘন কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে। ষষ্ঠ তলার এক ব্যক্তি ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করলেও তালাবদ্ধ দরজার কারণে উপরে উঠতে পারেননি।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম জানান, শুরুতে নিচ থেকে পানি ছিটিয়েও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছিল না। পরে মই এনে ভেতরে ঢুকে পানি দেওয়ার পর পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। শক্ত কাঁচ ও গ্রিল কাটতে দেরি হওয়ায় অনেকেই আটকা পড়ে যান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঢাকার অনেক ভবনে নিরাপত্তার অজুহাতে ছাদের দরজা তালাবদ্ধ রাখা হয়। এই প্রবণতাই এই দুর্ঘটনায় প্রাণহানির বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই অগ্নিকাণ্ডে নিহত পঞ্চম তলার বাসিন্দারা হলেন কাজী ফজলে রাব্বি রিজভী (৩৮), তার স্ত্রী আফরোজা আক্তার সুবর্ণা (৩৭) এবং তাদের আড়াই বছরের ছেলে কাজী ফাইয়াজ রিশান। রাব্বি এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসে এবং তার স্ত্রী সুবর্ণা স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসে কর্মরত ছিলেন। তাদের বড় ছেলে নানীর বাসায় থাকায় প্রাণে বেঁচে যায়।
ষষ্ঠ তলার বাসিন্দাদের মধ্যে নিহত হন মো. হারিছ উদ্দিন (৫২), তার ছেলে মো. রাহাব (১৭) এবং ভাতিজি রাহমাতুল ইসলাম রোদেলা (১৪)। রাহাব সিভিল অ্যাভিয়েশন কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং রোদেলা শাহীন ক্যাডেট স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ছিল।
হারিছের ভাই শহীদুল জানান, আগুনের সময় তিনি স্ত্রী ও এক সন্তানসহ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। অন্য কক্ষে হারিছ তার সন্তান ও ভাতিজিকে নিয়ে ছাদের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলেও ধোঁয়ার কারণে তারা আর বের হতে পারেননি।
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. শাওন বিন রহমান জানান, নিহত আফরোজা আক্তারের শরীরে কোনো পোড়া ক্ষত ছিল না। ধোঁয়ার বিষক্রিয়ায় তার মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি কাজী মো. রফিক আহমেদ জানান, নিহত ছয়জনের কারও শরীরেই দগ্ধ হওয়ার চিহ্ন পাওয়া যায়নি। আগুনের সূত্রপাত ও ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। বাড়ির মালিক জুয়েল মোল্লার সঙ্গেও কথা বলা হবে বলে জানান তিনি।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের ঢাকা মেট্রো উত্তরের সহকারী পুলিশ সুপার এ কে এম নাসিরুদ্দি বলেন, আগুনের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে একাধিক সংস্থা যৌথভাবে তদন্ত করছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাবে না।
শুক্রবার জুমার নামাজের পর হারিছ, তার ছেলে রাহাব ও ভাতিজি রোদেলার এবং আসরের নামাজের পর রাব্বি, সুবর্ণা ও তাদের সন্তান রিশানের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে মরদেহগুলো তাদের গ্রামের বাড়িতে দাফনের জন্য পাঠানো হয়।
এই ঘটনায় আবারও রাজধানীর আবাসিক ভবনগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ছাদের দরজা তালাবদ্ধ রাখার প্রবণতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে