ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির মন্তব্যে টিআইবি ও অধিকারের গভীর উদ্বেগ
অনলাইন ডেস্ক
পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ আলী হোসেন ফকিরের সাম্প্রতিক এক মন্তব্য ঘিরে তোলপাড় শুরু হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, সরকার অনুমোদন দিলে আইন প্রয়োগের প্রয়োজনে ক্রসফায়ার করতে পুলিশ পিছপা হবে না। এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং মানবাধিকার সংস্থা অধিকার। অধিকার এই ধরনের বক্তব্যের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
টিআইবি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বা ব্যর্থতা আড়ালের পরিবর্তে বিচারবহির্ভূত পদক্ষেপকে অপরাধ দমনের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করার বার্তাটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। সংস্থাটি আইজিপির এই বক্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহার, তার প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টির সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ঢালাও অভিযোগ মুক্ত গণমাধ্যমের নজরদারি ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে এবং স্বাধীন সাংবাদিকতাকে নিরুৎসাহিত করার ঝুঁকি তৈরি করে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পুলিশপ্রধানের এই অবস্থান পেশাগত দেউলিয়াত্বের ইঙ্গিত দেয়। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, সরকার ক্রসফায়ারের অনুমতি দেবে—এই শর্ত জুড়ে দেওয়া কি আসলে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি? তার মতে, পুলিশের দায়িত্ব হলো পেশাদার তদন্ত ও অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে বিচারের আওতায় আনা, বিচারপ্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে জীবন কেড়ে নেওয়া নয়। আইনমন্ত্রী গত ১৪ সেপ্টেম্বর যেখানে জানিয়েছিলেন যে সরকার সন্ত্রাস দমনে ক্রসফায়ারের পথে যাবে না, সেখানে পুলিশপ্রধানের এই বিপরীতমুখী ও অপরিণামদর্শী বক্তব্য কেন এলো, তা নিয়ে সংস্থাটি সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। সরকারের অনুমতির শর্ত জুড়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা আইনসম্মতভাবে অপরাধ দমনে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি কিনা, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। এর বিকল্প হিসেবে ক্রসফায়ারকে সামনে আনা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সমাধান নয়; বরং পেশাগত দেউলিয়াত্বের দৃষ্টান্ত। অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, বিচারপ্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে কাউকে হত্যার এখতিয়ার পুলিশের নেই। অতীতের বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, সিনহা হত্যা মামলায় পুলিশ সদস্যদের দণ্ড এবং মামলার রায়সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ এ পদ্ধতির ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে দেয়। অতীতের এসব ঘটনা থেকে পুলিশ কী শিক্ষা নিয়েছে, সে প্রশ্নের উত্তর আইজিপিকেই দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন ইফতেখারুজ্জামান। সংস্থাটি বলেছে, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। যার দায়িত্ব বাহিনীকে আইনের মধ্যে থেকে পরিচালনা করা, তিনিই ক্রসফায়ারকে বিকল্প হিসেবে সামনে আনলে তার দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বের উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও উল্লেখ করেন, সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জীবনের অধিকার ও আইনের সুরক্ষা নির্বাহী আদেশে ক্ষুণ্ণ করা যায় না। অতীতে সিনহা হত্যা মামলা, নারায়ণগঞ্জের সাত খুন এবং টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হকের মৃত্যুর ঘটনাগুলো বিচারবহির্ভূত বলপ্রয়োগের ভয়াবহতা প্রমাণ করেছে। সাংবাদিকের সমালোচনা ও পুলিশের কর্মপরিবেশ নিয়ে আইজিপির মন্তব্যকেও তিনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বৈধ পর্যালোচনার পরিপন্থী বলে মনে করেন। সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত আইনের আশ্রয়লাভ এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নির্বাহী সিদ্ধান্তে বাতিল করা যায় না। টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হক কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনায় তাঁর পরিবারের প্রকাশ করা অডিও এবং হত্যার অভিযোগও ব্যাপক প্রশ্ন তুলেছিল। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় সাবেক র্যা ব কর্মকর্তাদের দণ্ড আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতার অপরাধমূলক ব্যবহারের বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত উদাহরণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকার তাদের বিবৃতিতে ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে দীর্ঘ সময় ধরে চলা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের ভয়ংকর ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। সংস্থাটি মনে করে, বর্তমান পরিস্থিতিতে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তার এমন বক্তব্য বাহিনীকে বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের জন্য একটি প্রচ্ছন্ন ছাড়পত্র দেওয়ার সমান। বর্তমান সরকারের মেয়াদেও তারা ইতিমধ্যে পাঁচটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে বলে দাবি করেছে অধিকার। ওদিকে, বিবৃতিতে অধিকার জানায়, ফ্যাসিস্ট হাসিনার সাড়ে ১৫ বছর শাসনামলে ব্যাপকভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। ঐ সময়ে ভিন্নমভাবলম্বী ও রাজনৈতিক নেতা কর্মী সহ সাধারণ মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছিলেন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দায়ে বিলুপ্ত র্যাব (বর্তমানে এসআরবি) কে যুক্তরাষ্ট্র কালো ভালিকা ভুক্ত করে। বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ইতিমধ্যে ৫ টি বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে অধিকার ডকুমেন্ট করেছে।
বিবৃতিতে অধিকার জোর দিয়ে বলেছে, আইজিপির এই বক্তব্য জনমনে নতুন করে ভীতির সৃষ্টি করেছে। তারা পুলিশের সর্বোচ্চ পদধারী ব্যক্তির এই বক্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি, সম্প্রতি সংগঠিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডগুলোর নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করে দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আগ্নেয়াস্ত্রের প্রাণঘাতী ব্যবহার কেবল জীবন বাঁচানোর অনিবার্য পরিস্থিতিতেই বৈধ হতে পারে, এর বাইরে নয় বলে টিআইবি ও অধিকার উভয়ই তাদের অবস্থান ব্যক্ত করেছে।