বাংলাদেশে ৬.৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ জাপানের, সই একাধিক চুক্তি
অনলাইন ডেস্ক
জাপান সফরের দ্বিতীয় দিনে ব্যস্ত সময় পার করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘কানতেই’-এ দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে তার এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাপানের বহু বছরের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে ‘কৌশলগত অংশীদারিত্বে’ উন্নীত করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তসহ তা নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে দুই শীর্ষ নেতা একমত পোষণ করেন। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও টেকসই উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা উন্মোচিত হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়। বৈঠক শেষে জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান তারেক রহমান।
দ্বিপক্ষীয় এই বৈঠকে বাংলাদেশে ১ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা প্রায় ৬.৩ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বিশেষ করে দেশের জ্বালানি, অবকাঠামো এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে জাপানি উদ্যোক্তাদের বড় ধরনের বিনিয়োগের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার পাশাপাশি তারেক রহমান বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক গড়ে তোলা, দেশের ৬টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে সংযুক্ত করতে দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক নির্মাণ, সারা দেশে উড়াল সড়ক তৈরি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে জাপানি বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেন। আমরা একসঙ্গে কাজ করলে আমাদের দুই মহান দেশের জন্য আরও সহনশীল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবো। আমরা এই দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের জন্য গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। এই বিনিয়োগের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দ্রুত বাংলাদেশে জাপানি প্রতিনিধিদল পাঠানোর বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
বৈঠক চলাকালে দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি সই এবং তিনটি সমঝোতা স্মারক হস্তান্তরিত হয়। বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বৃদ্ধির পেক্ষাপটে দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় করার অঙ্গীকার করেছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। তারা দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরবিষয়ক চুক্তি সই এবং তা কার্যকর হওয়াকে স্বাগত জানান। এছাড়াও যৌথ ঘোষণায় জানানো হয়, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে জাপানের সরকারি উন্নয়ন সহায়তার (ওডিএ) অধীনে একটি টহলজাহাজ দেবে জাপান। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির নিরিখে নিজস্ব স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষ অংশীদারিত্বমূলক উদ্যোগ ‘বিগ-বি’ সামনে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। এ ছাড়া জাপানের সরকারি নিরাপত্তা সহায়তা কর্মসূচির আওতায় পাঁচটি টহলবোট দেয়ার কথা বলা হয়েছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের বড় অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে সমুদ্র পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, উপকূলীয় টহল ও বন্দরের নিরাপত্তায় সহযোগিতা বাড়ানোর কথা জানিয়েছে জাপান। তিনি বলেন, শান্তিপ্রিয় দেশ জাপান ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রথম দিকেই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানকারী দেশগুলোর অন্যতম। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে জাপান বাংলাদেশের অন্যতম মূল্যবান উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি ও অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং দেশে ব্যবসার পরিবেশ আরও উন্নত করতে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে। পাশাপাশি খাদ্য, কৃষি, মৎস্য ও পশুপালন খাতে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বাড়াতে জাপানের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পৃথক দুটি সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়েছে। বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, সমুদ্রসম্পদ ও অবকাঠামোগত সহযোগিতার নানা দিক বিস্তারিত উঠে আসে, যার সব ক্ষেত্রসমূহ পরবর্তীতে যৌথ বিবৃতিতে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বৈঠক উত্তর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের মেলবন্ধন কয়েক দশকের আস্থা, শ্রদ্ধা ও সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই ঐতিহাসিক বন্ধুত্বকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও যৌথ উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশে বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিবেশ ও সুযোগগুলো কাজে লাগাতে তিনি জাপানের ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। সফরকালে উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য সানায়ে তাকাইচি ও দেশটির জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি স্মরণ করেন যে, বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে জাপানের অবদান ও সুসম্পর্কের এক বিশেষ স্থান রয়েছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা এবং শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার অভিন্ন লক্ষ্যের ভিত্তিতে আমাদের বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও সংবাদ সম্মেলন শেষ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তারেক রহমানের সম্মানে আয়োজিত এক মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল। এরপর বিকেল থেকেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থান পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। দুপুর আড়াইটার দিকে চিবা প্রিফ্যাকচারের ফুতসু শহরে অবস্থিত ‘জেরা’ (JERA)-র স্থলভিত্তিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘুরে দেখেন তিনি। সেখান থেকে বিকেলে চিবা প্রিফ্যাকচারের ইচিকাওয়া শহরে পরিচালিত ‘নিপ্পন এক্সপ্রেস’-এর অধীনস্থ বিখ্যাত ‘নিটসু লজিস্টিকস হাব’ পরিদর্শনে যান। মঙ্গলবার জাপানের স্থানীয় সময় বিকাল পৌনে ৫ টায় চিবা প্রিফ্যাকচারের ইচিকাওয়া শহরে অবস্থিত নিটসু লজিস্টিকস হাব তিনি পরিদর্শন করেন।
এসব পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা। সফরের পরবর্তী দিন বুধবার মিৎসুই সহ তিনটি প্রধান জাপানি কোম্পানি এবং বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক ফোরামের একাধিক দ্বিপক্ষীয় কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তারেক রহমানের। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন এ কথা জানান। আসিফ আসাদ, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান।