|
|
সোমবার, ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সর্বস্বত্ব মুখপত্র কর্তৃক সংরক্ষিত

বিজ্ঞাপন | ব্যানার স্পট

আপনার ব্যবসার প্রসারে আমাদের জনপ্রিয় নিউজ ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দিন!

বিজ্ঞাপন দিন →

তালেবানের সঙ্গে বিশ্বে বাড়ছে যোগাযোগ, মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:৫৯ পিএম
৮ পঠিত
00:00
00:00
তালেবানের সঙ্গে বিশ্বে বাড়ছে যোগাযোগ, মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ
জাতিসংঘ: তালেবান শাসিত আফগানিস্তান ‘মানবাধিকারের কবরস্থান’/ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

আফগানিস্তানে তালেবান সরকার ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার পথে। এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উঠতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে গোষ্ঠীটি। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বেশ কয়েকটি দেশ তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়াচ্ছে।

২০২১ সালে দুই দশকের সংঘাতের পর তালেবান কাবুলের ক্ষমতা দখল করে। এরপর তাদের সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি না দিয়ে বিভিন্ন দেশ দূরত্ব বজায় রাখে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশ তালেবান কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছে এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের নতুন পথ তৈরি করছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, দেশগুলোর পৃথকভাবে তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর ফলে নারীর অধিকার ও মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

জাতিসংঘের মতে, তালেবান ক্ষমতায় আসার পর একের পর এক আইন ও নির্দেশনার মাধ্যমে নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও অধিকাংশ চাকরি থেকে দূরে রাখা হয়েছে। কিশোরীদের শিক্ষা বন্ধ করা হয়েছে এবং নারীদের পোশাকের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন এবং সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ রয়েছে। জাতিসংঘ ২০২৬ সালের মার্চে আফগানিস্তানের পরিস্থিতিকে মানবাধিকারের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছিল।

ভারত, কাতার, চীন, ইরান ও মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশ সাম্প্রতিক সময়ে তালেবান কর্মকর্তাদের স্বাগত জানিয়েছে অথবা যোগাযোগের নতুন মাধ্যম চালু করেছে। রাশিয়া এক বছরের বেশি সময় আগে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর গত মাসে তাদের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা চুক্তিও করেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নও জুন মাসে ব্রাসেলসে তালেবান প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠকে মূলত আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানো ব্যর্থ আশ্রয়প্রার্থীদের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। যদিও ইউরোপীয় কমিশন এটিকে কেবল কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা হিসেবে বর্ণনা করেছে, তালেবান পক্ষ বৈঠকটিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে তুলে ধরেছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের আফগানিস্তানবিষয়ক গবেষক ফেরেশতা আব্বাসি বলেন, মানবিক সংকট মোকাবিলায় তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন থাকতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত নারীর অধিকার ও মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতির বিষয়ে তালেবানের প্রতি অভিন্ন ও ধারাবাহিক বার্তা দেওয়া।

বিশ্লেষকদের মতে, তালেবানের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ বাড়ানোর পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, পশ্চিমা দেশগুলোর অবৈধ অভিবাসন কমানোর চাপ এবং তালেবানকে অদূর ভবিষ্যতে ক্ষমতা থেকে সরানোর সম্ভাবনা কমে যাওয়া।

মধ্য এশিয়ার তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান ও কাজাখস্তানের কর্মকর্তারাও চলতি বছর কাবুলসহ আফগানিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় সফর করেছেন। এসব যোগাযোগের অন্যতম লক্ষ্য বাণিজ্যপথ ও পাইপলাইন প্রকল্পের মাধ্যমে সমুদ্রবন্দর বা তৃতীয় দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো।

ভারতও ২০২১ সালে তালেবান কাবুল দখলের পর তৈরি হওয়া দূরত্ব কমিয়ে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে। এর পেছনে পাকিস্তানের সঙ্গে তালেবানের সাম্প্রতিক টানাপোড়েনও একটি কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।

গত বছর ভারত তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকিকে ভ্রমণের জন্য নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় পাওয়ার ব্যবস্থা করে। চলতি বছরের জুনে জাতিসংঘে ভারতের প্রতিনিধি হারিশ পার্বাথানেনি তালেবানের ওপর থাকা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, সম্পদ জব্দ এবং অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থাগুলো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।

তালেবান সরকার চীন, জাপান, তুরস্ক ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের কাবুলে স্বাগত জানিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও গত বছর প্রায় এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো কাবুল সফর করেন।

তালেবানের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেছেন, আফগানিস্তানের ইসলামিক আমিরাত সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়। তবে প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে তারা বিশেষ গুরুত্ব দেয়, কারণ আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও যোগাযোগের বড় অংশ এসব দেশের সঙ্গে যুক্ত।

রাশিয়ার তালেবানকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর পেছনেও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, আফগানিস্তান রাশিয়ার জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং মধ্য এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে মস্কো তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ককে কাজে লাগাতে চাইছে।

ব্রিটেনও তালেবানের সঙ্গে ‘সীমিত ও বাস্তবভিত্তিক’ যোগাযোগের নীতি অনুসরণ করছে। কাতারে অবস্থিত ব্রিটিশ মিশনের মাধ্যমে এ যোগাযোগ চালানো হচ্ছে। অন্যান্য পশ্চিমা দেশও কাতারে তালেবান কর্মকর্তাদের সঙ্গে গোপন বা অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেছে।

অর্থনীতি ও অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও তালেবান বিদেশি অংশীদার খুঁজছে। সীমান্তবর্তী অবকাঠামো প্রকল্পের পাশাপাশি আফগানিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদও বিভিন্ন দেশের আগ্রহের কারণ হয়ে উঠেছে। চীনসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আফগানিস্তানের খনি খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

চীন আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘাতের সময়ও আলোচনার উদ্যোগে ভূমিকা রেখেছে। দেশটির উদ্বেগের একটি বড় কারণ হলো আফগানিস্তান ও আশপাশের অঞ্চলে ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা।

তবে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়লেও তালেবানের অভ্যন্তরীণ নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নারীদের শিক্ষা নিষিদ্ধ করার মতো বিষয় নিয়ে তালেবানের ভেতরে মতবিরোধ থাকলেও সবচেয়ে রক্ষণশীল অংশের প্রভাব এখনো শক্তিশালী।

সাম্প্রতিক আইনগুলোতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং ভিন্নমত দমনে শাস্তির বিধান আরও জোরদার করা হয়েছে। নারীদের ওপর সহিংসতা নিয়েও নতুন আইনে কঠোরতার পরিবর্তে সীমিত সংজ্ঞা ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি নারীদের সম্মতি ছাড়া বিয়ের সুযোগ তৈরি করার মতো বিধানও এসব আইনে রাখা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, তালেবানের নীতিতে অদূর ভবিষ্যতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা নেই। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার কর্তৃত্ব এখনো অটুট এবং তালেবান নেতৃত্বের মূল অগ্রাধিকার দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক এজেন্ডা।

পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় ও কার্নেগি এনডাওমেন্টের গবেষক রামিন মানসুরি মনে করেন, তালেবান আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ালেও উল্লেখযোগ্য ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তাঁর মতে, তালেবান নেতৃত্বের বড় অংশের আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি সীমিত এবং তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ নীতিকেই অগ্রাধিকার দেবে।

ফলে তালেবানের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়লেও মানবাধিকার, বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ কতটা কার্যকর থাকবে—এ নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। 

বিজ্ঞাপন | ব্যানার স্পট

আপনার ব্যবসার প্রসারে আমাদের জনপ্রিয় নিউজ ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দিন!

বিজ্ঞাপন দিন →