কঙ্গোতে নতুন এলাকায় ছড়াল ইবোলা, কেনিয়ায় আক্রান্তের মৃত্যু
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আফ্রিকার দেশ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোতে (ডিআর কঙ্গো) ইবোলা সংক্রমণ নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। একই সময়ে কঙ্গো থেকে কেনিয়ায় যাওয়া এক ব্যক্তির ইবোলায় মৃত্যু হওয়ায় সীমান্ত পেরিয়ে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ৮ অক্টোবর প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে জানায়, কঙ্গোর উত্তর কিভু প্রদেশের আলিমবঙ্গো স্বাস্থ্য অঞ্চলে প্রথমবারের মতো ইবোলা শনাক্ত হয়েছে। ৬ অক্টোবর পর্যন্ত ওই এলাকায় চারজনের সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়, যাদের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।
বুন্দিবুগিও ভাইরাসের কারণে এবারের ইবোলা প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, কঙ্গোর সাতটি প্রদেশের ৬৪টি স্বাস্থ্য অঞ্চলে সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। মোট আক্রান্তের হিসাবে ইতুরি প্রদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। তবে নতুন শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে উত্তর কিভুতে।
৬ অক্টোবর পর্যন্ত কঙ্গোতে ইবোলায় আক্রান্ত ৮ হাজার ৭২৮ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ৪ হাজার ২০৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং সুস্থ হয়েছেন ২ হাজার ২৬৯ জন। সংক্রমণের তুলনায় মৃত্যুর হার দাঁড়িয়েছে ৪৮ দশমিক ২ শতাংশে।
কেনিয়ায় প্রথম আমদানি করা সংক্রমণ শনাক্ত
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, ৬ অক্টোবর কেনিয়ায় বুন্দিবুগিও ভাইরাসজনিত রোগের প্রথম আমদানি করা সংক্রমণ নিশ্চিত হয়। ওই ব্যক্তি কেনিয়ার নাগরিক হলেও কঙ্গোতে বসবাস করতেন। সেখানে অসুস্থ হওয়ার পর কয়েকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নেন তিনি।
পরে উগান্ডা হয়ে কেনিয়ায় প্রবেশ করেন ওই ব্যক্তি। সড়কপথে উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় যাওয়ার পর বিমানে নাইরোবি পৌঁছান ৩ অক্টোবর। হাসপাতালে আইসোলেশনে রেখে পরীক্ষা করা হলে তাঁর শরীরে ইবোলা শনাক্ত হয়। চিকিৎসা দেওয়া হলেও ৫ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়।
কেনিয়ার কর্তৃপক্ষ পরিবারের সদস্য ও স্বাস্থ্যকর্মীসহ ২৮ জনকে সম্ভাব্য সংস্পর্শে আসা ব্যক্তি হিসেবে শনাক্ত করেছে। নাইরোবিগামী বিমানের যাত্রী ও কর্মীদেরও খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংক্রমণ ঠেকাতে কেনিয়া ও উগান্ডায় সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এদিকে, কেনিয়ার ওয়াজির কাউন্টিতে ইবোলার সন্দেহভাজন একটি সংক্রমণের প্রাথমিক পরীক্ষার ফল ৮ অক্টোবর নেগেটিভ আসে। এতে দ্বিতীয় সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমলেও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
চিকিৎসাসেবায় বাড়ছে চাপ
কঙ্গোতে ইবোলা মোকাবিলায় চিকিৎসার সীমিত সক্ষমতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর একাংশের অনাস্থা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ওয়াতোতো রেডিওর প্রতিষ্ঠাতা ড্যানিয়েল মাকাসি লেভেরজেনোয়া বলেছেন, নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ও ভুল তথ্যের কারণে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা ব্যাহত হচ্ছে। উত্তর কিভুর বেনি ও বুতেম্বো এলাকায় ইবোলা নিয়ে গুজব এবং ভুল ধারণার কারণে কিছু বাসিন্দা স্বাস্থ্যকর্মীদের সহযোগিতা করতে অনীহা প্রকাশ করছেন।
চিকিৎসা সহায়তাকারী সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ) ৫ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে জানায়, আগস্টের শেষ দিকে কঙ্গোতে নতুন শনাক্ত সংক্রমণের ২৪ শতাংশ ছিল উত্তর কিভুতে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তা বেড়ে প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছায়।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইবোলায় আক্রান্ত নিশ্চিত রোগীদের ৩৪ শতাংশকে সাধারণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় অনেক রোগীকে এসব কেন্দ্রে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। রোগ শনাক্তে বিলম্বের কারণেও কিছু রোগীকে ইবোলা চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত নয়—এমন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
এমএসএফ সতর্ক করেছে, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোরই ইবোলা রোগীদের নিরাপদে চিকিৎসা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও দক্ষতা নেই। এতে রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ছে।
বুতেম্বোর এমএসএফ পরিচালিত ইবোলা চিকিৎসাকেন্দ্রের সমন্বয়ক স্টেফানি হফম্যান বলেন, কয়েক সপ্তাহ ধরেই চিকিৎসার সক্ষমতা সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে। পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় কখনো কখনো নিশ্চিতভাবে আক্রান্ত রোগীদের অন্যত্র পাঠাতে হচ্ছে, যা আশপাশের মানুষের জন্য
ঝুঁকি তৈরি করছে।
মানুষের অনাস্থা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বাধা
বেনির স্থানীয় নেতা আলবার্তো লুসেঙ্গে বলেছেন, ইতুরি প্রদেশে শুরুতেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা এবং বেনি ও বুতেম্বোতে স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় মানুষের উদ্বেগ বেড়েছে।
তাঁর মতে, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি অনাস্থা বাড়লে মানুষ উপসর্গ গোপন করতে পারে বা চিকিৎসা নিতে দেরি করতে পারে। এতে উত্তর কিভুতে সংক্রমণ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ৪ অক্টোবর পর্যন্ত শনাক্ত করা ২৯ হাজার ৫৩৫ জন সম্ভাব্য সংস্পর্শে আসা ব্যক্তির মধ্যে ২৩ হাজার ৭৪১ জনকে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হয়েছিল। অর্থাৎ, অনুসরণ কার্যক্রমের আওতায় ছিলেন ৮০ দশমিক ৪ শতাংশ। সংস্থাটির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অন্তত ৮৫ শতাংশ।
সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা মানুষদের শনাক্ত করে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করলে উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙা সহজ হয়। এ কাজে ঘাটতি থাকলে রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে।
আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে সংক্রমণ শনাক্ত, নিয়মিত যোগাযোগ অনুসরণ এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
টিকা ও নির্দিষ্ট চিকিৎসা না থাকায় উদ্বেগ
কঙ্গোতে ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ইবোলার আরেকটি প্রাদুর্ভাবে প্রায় ২ হাজার ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। তবে এবারের প্রাদুর্ভাবের কারণ ভিন্ন প্রজাতির ভাইরাস।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, বুন্দিবুগিও ভাইরাসজনিত রোগের জন্য এখনো অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। এ কারণে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা, সহায়ক চিকিৎসা দেওয়া এবং সংক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা জোরদার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন নতুন এলাকায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া এবং চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে শয্যার সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জন ও সীমান্তবর্তী দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোও জরুরি হয়ে উঠেছে।
আফ্রিকা সিডিসির মহাপরিচালক জ্যঁ কাসেয়া বলেছেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা প্রত্যেককে শনাক্ত করতে হবে, তাঁদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। সংক্রমণের শেষ শৃঙ্খলটি ভাঙতে পারলেই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।