|
|
বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সর্বস্বত্ব মুখপত্র কর্তৃক সংরক্ষিত

বিজ্ঞাপন | ব্যানার স্পট

আপনার ব্যবসার প্রসারে আমাদের জনপ্রিয় নিউজ ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দিন!

বিজ্ঞাপন দিন →

বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও বিরোধী দলের বর্তমান ভূমিকা

মুখপত্র অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর, ২০২৬, ০৬:৪০ এএম
২২ পঠিত
00:00
00:00
বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও বিরোধী দলের বর্তমান ভূমিকা

গণতন্ত্র রক্ষা এবং একে সুসংহত করার প্রক্রিয়ায় সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলের ভূমিকা অপরিহার্য। তবে এই আলোচনা করার সময় আমরা প্রায়ই একটি মৌলিক বিষয় এড়িয়ে যাই—আমরা আসলে ঠিক কোন ধরনের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই? গণতন্ত্রের রূপ নানাবিধ হতে পারে। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক যাত্রার সূচনা হলেও, তা নানা রূপ নিতে পারে। কখনো ক্ষমতা একক দল বা ব্যক্তির হাতে পুঞ্জীভূত হয়ে ‘সংখ্যাগুরুর স্বৈরতন্ত্র’ তৈরি করে, আবার কখনো অভিজাতদের পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে ক্ষমতার নতুন সমীকরণ গড়ে ওঠে। আমরা যত বেশি নিছক ‘ভোটকেন্দ্রিক’ চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে নীতিনির্ধারণে নাগরিককে সম্পৃক্ত করার দিকে যাব, বিরোধী দলের গুরুত্ব ততটাই বাড়বে।

বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ধারণাটি অনেকের কাছেই অত্যন্ত সীমিত। মূলত পাঁচ বছর অন্তর নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার রদবদল ঘটলেই রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক হিসেবে গণ্য করা হয়। এই ন্যূনতম সংজ্ঞাকে পুরোপুরি ভুল বলা না গেলেও, আমাদের মনোযোগ কেবল নির্বাচনের দিনটিতেই সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক নয়। যদি আমাদের লক্ষ্য হয় এমন একটি প্রতিনিধিত্বমূলক উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যেখানে সরকারি নীতি রাজনৈতিক আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রুখতে নির্বাহী বিভাগের ওপর কঠোর নজরদারি থাকবে, তবেই বিরোধী দলের প্রকৃত কার্যকর ভূমিকার সুযোগ তৈরি হয়। লক্ষ্য একটাই, যাতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নীতিনির্ধারণের সময় জনগণের আসল কণ্ঠস্বর ও উদ্বেগের প্রতিফলন ঘটে। বাংলাদেশ যে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও মূলত একটি সর্বজনীন গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না—এই সত্য গ্রহণে দলটির ঐতিহাসিক দ্বিধা রয়েছে।

বাস্তবে কোনো ক্ষমতাসীন দলই স্বেচ্ছায় নিজেদের ক্ষমতা সীমিত করতে চায় না। তাই রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার যৌক্তিকতা তুলে ধরা, নাগরিক সমাজের সঙ্গে কার্যকর মিত্রতা তৈরি এবং কাঠামোগত সংস্কারের জন্য সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করাই বিরোধী দলের মূল কাজ হওয়া উচিত। তবে প্রতিনিধিত্বমূলক উদার গণতন্ত্রের বড় সীমাবদ্ধতা হলো এটি নীতিনির্ধারণে সাধারণ মানুষের সরাসরি প্রভাবের পথ সংকুচিত করে এবং অভিজাতদের দর-কষাকষির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। গণতন্ত্রের নির্বাচনী, উদার প্রাতিষ্ঠানিক ও অংশগ্রহণমূলক এই তিন মাত্রাকে সমন্বিত করাই এখনকার বড় চ্যালেঞ্জ। গণতন্ত্রের মূল সংগ্রামটিই হলো এই দুই চরমপন্থার মাঝখানে সঠিক ভারসাম্য খুঁজে নেওয়া। এই কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বিরোধী দল পাঁচ বছর ধরে নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহির আওতায় আনার কোনো সুযোগ পায় না, অথচ পাঁচ বছর পর বিশাল ক্ষমতা নিয়ে সরকার গঠনের দৌড়ে নেমে পড়ে। প্রতিনিধিরা যেন সুনির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক সংকীর্ণ দাবির ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, এই তত্ত্বের সুযোগ নিয়ে বাস্তবে নাগরিকদের মতামতকে উপেক্ষিত রাখা হয়। অবশ্যই এমন অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাকে সাংবিধানিক সুরক্ষার আওতায় রাখতে হয়, যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠের চাওয়ায় সংখ্যালঘুর অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়। এই ক্লান্তিহীন ও ধৈর্যশীল কাজ ছাড়া গণ–আস্থা অর্জন করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের বর্তমান বিরোধী দলগুলো এই দায়িত্ব পালনে কতটা সফল? দুঃখজনকভাবে তাদের রাজনীতি এখনো সংঘাতকেন্দ্রিক এবং জনমুখী চিন্তাভাবনা থেকে অনেকটাই দূরে। একটি প্রগতিশীল ও গঠনমূলক বিরোধী রাজনীতি গড়ে তুলতে হলে তাদের কয়েকটি বিষয়ে কঠোর নজর দেওয়া জরুরি। প্রথমত, শুধু সরকারি কর্মকাণ্ডের সমালোচনা নয়, বরং টেকসই রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের স্পষ্ট রূপরেখা জনগণের সামনে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। ক্ষমতাসীনদের মধ্যে ফাটল ধরাতে সুশীল সমাজের সঙ্গে মিলে একটি পাল্টা সংস্কারবাদী অক্ষ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। গঠনমূলক বিকল্প নীতি উপস্থাপন না করে ১৯৯০-এর দশকের পুরোনো কৌশল নিয়েই তারা হাঁটছে।

দ্বিতীয়ত, ‘লংমার্চ’ বা শক্তি প্রদর্শনের চিরাচরিত কর্মসূচির কার্যকারিতা প্রায় তলানিতে। বিরোধী দলগুলোকে তাদের সমর্থক গোষ্ঠীর বাইরে বেরিয়ে আপামর মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হবে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও দুর্নীতির মতো বিষয়গুলো যে বিদ্যমান শাসনব্যবস্থারই কুফল, তা সাধারণ মানুষকে প্রাঞ্জল ভাষায় বোঝাতে হবে। তৃতীয়ত, একটি সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার ভিশন থাকা আবশ্যক। ধর্ম, জাতি বা লিঙ্গপরিচয় নির্বিশেষে সব নাগরিকের অধিকার রক্ষার নিশ্চয়তা বিরোধী দলের অঙ্গীকারে স্পষ্টভাবে থাকা উচিত।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিরোধী শক্তি জামায়াতে ইসলামীর কথা বললে দেখা যায়, তারা বস্তুনিষ্ঠ সংস্কার প্রস্তাবের চেয়ে মুখোমুখি সংঘাত ও আবেগসর্বস্ব রাজনীতিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। ‘সংস্কার’ শব্দটি তারা রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করলেও, নিজেদের আদর্শের সঙ্গে মেলে না এমন অনেক প্রস্তাবেই তারা নীরব। বিশেষ করে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশ্নে তাদের অবস্থান দ্বিধাদ্বন্দ্বে পূর্ণ। দলটি মুখে প্রচুর নারী নেতৃত্বের দাবি করলেও নির্বাচনে নারী প্রার্থী মনোনয়নে চরম ব্যর্থ। এছাড়া তাদের প্রদর্শিত রাজনৈতিক দর্শন একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ এবং ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংখ্যালঘুদের আস্থা অর্জনে তারা পুরোপুরি ব্যর্থ। এমন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় বিরোধীদের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ আশা করা যায় না। শাসক দল যখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্নির্মাণে অনিচ্ছুক, সমালোচনা সহ্য করতে নারাজ, আমলাতন্ত্রের দলীয়করণে ব্যস্ত, দল ও সরকারকে একাকার করে ফেলছে এবং নিজস্ব কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ, তখন ক্ষমতাসীন দল নিজে থেকে কোনো সংস্কার করবে, এমন আশা করা ভুল।

অন্যদিকে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) মতো তুলনামূলক তরুণ দলগুলোর ক্ষেত্রে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। তাদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের আন্তরিকতা রয়েছে এবং তাদের সংসদ সদস্যরাও সংসদে যুক্তি ও বিকল্প নীতির রূপরেখা তুলে ধরছেন। কিন্তু দলটি নাগরিকদের সঙ্গে নিবিড় সম্পৃক্ত হতে বা রাজনৈতিক সাহসের পরিচয় দিতে প্রায়ই ব্যর্থ হয়। অনেক সময় তারা নিজেদের নীতিগত অবস্থানে অবিচল থাকতে পারে না। এছাড়া দলের ভেতরে জনতুষ্টিবাদী বক্তব্য, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য এবং ষড়যন্ততত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়ার মতো নেতিবাচক রাজনীতির চর্চাও দলের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের দায় নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণে দলটি এখনো অনাগ্রহী। রাজনৈতিক সুবিধাবাদের অংশ হিসেবে তারা সমাজে সাংস্কৃতিক বিভাজন বাড়াতে এবং ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদী জনস্রোতে ভাসতে মুখিয়ে থাকে।

বাংলাদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির অবস্থাও বেশ নাজুক। সংসদের বাইরে থাকা বামপন্থী দলগুলো তীব্র সাংগঠনিক সক্ষমতার অভাবে ভুগছে। চরম ডানপন্থী দলগুলোর আদর্শ উদার গণতন্ত্রের ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। আবার নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সদিচ্ছা ও আধুনিক মূল্যবোধ থাকলেও, একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক মেরু হিসেবে দাঁড়াতে তাদের অনেক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, একটি দেশের বিরোধী দলের প্রকৃত শক্তি শুধু সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা বা ক্ষমতার লড়াইয়ের ওপর নির্ভর করে না। এটি পরিমাপ করা হয় প্রতিষ্ঠান গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকার, নাগরিক সম্পৃক্ততা ও অজনপ্রিয় হলেও সত্য বলার সৎ সাহসের মাধ্যমে। বাংলাদেশের আজ এমন এক বিরোধী রাজনীতির প্রয়োজন, যা ক্ষমতার লড়াইয়ের ঊর্ধ্বে উঠে জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান এই বিশ্লেষণটি তুলে ধরেছেন।

বিজ্ঞাপন | ব্যানার স্পট

আপনার ব্যবসার প্রসারে আমাদের জনপ্রিয় নিউজ ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দিন!

বিজ্ঞাপন দিন →